স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নাম এখন ‘ন্যাটো’ (North Atlantic Treaty Organization)। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের উত্তরমুখী ও পূর্বমুখী সম্প্রসারণ বিশ্ব নিরাপত্তাকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের অন্তর্ভুক্তির পর ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ঘিরে জোটের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ মস্কোর সাথে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর এই সীমানা বৃদ্ধি কেবল প্রতিরক্ষা কৌশল নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে এক চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে।
ন্যাটোর সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য এখন পূর্ব ইউরোপ। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ন্যাটোর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইউক্রেনকে জোটের সদস্যপদ দেওয়ার রোডম্যাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্রেমলিন বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, রাশিয়ার দোরগোড়ায় ন্যাটোর উপস্থিতি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অস্তিত্ব সংকটের শামিল।
ইতিহাস বলছে, ১৯৯০-এর দশকে ন্যাটো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা এক ইঞ্চিও পূর্ব দিকে এগোবে না। কিন্তু বর্তমানে জোটের সীমানা রাশিয়ার সীমান্ত স্পর্শ করায় পুতিন প্রশাসন সামরিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ইউরোপের আকাশ এখন হাইপারসনিক মিসাইল আর মহড়া দিয়ে উত্তপ্ত। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে একটি ‘পারমাণবিক যুদ্ধের’ আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
ন্যাটো এখন আর কেবল আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে ন্যাটোর কৌশলগত অংশীদারিত্ব বেড়েছে। ন্যাটোর এই ‘এশীয় সংস্করণ’ বা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উপস্থিতি বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করেছে। চীন একে ‘এশীয় ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছে, এটি এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির মোকাবিলায় ন্যাটোর এই সক্রিয়তা দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্ররা, অন্যদিকে চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া অক্ষ—এই দুই মেরুকরণ বিশ্বকে এক নতুন ত্রিভুজ যুদ্ধের (Triple-Polarity) দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ন্যাটোর প্রতিটি সদস্য দেশ এখন তাদের জিডিপির অন্তত ২.৫% থেকে ৩% প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার অঙ্গীকার করেছে। ২০২৬ সালের বাজেটে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক বরাদ্দ গত ৫০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
জার্মানি ও ফ্রান্স: তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১৫% বৃদ্ধি করেছে।
পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলো: ন্যাটোর সামরিক অবকাঠামো নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালছে।
কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অস্ত্রশস্ত্রে ব্যয় হওয়ার ফলে জনকল্যাণমূলক খাত যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ রক্ষা অবহেলিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন মুদ্রাস্ফীতি আর জ্বালানি সংকটে জর্জরিত, তখন দেশগুলোর ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ স্টার্ট’ (New START) পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ কার্যত শেষ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব এখন এক নিয়ন্ত্রণহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। ন্যাটো যতই সম্প্রসারিত হচ্ছে, কূটনীতির পথ ততই সংকীর্ণ হয়ে আসছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. রিচার্ড হ্যাস-এর মতে, “ন্যাটো সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো পক্ষই এখন আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি নয়, বরং সবাই অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে পছন্দ করছে।”
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সাল একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। ন্যাটোর সম্প্রসারণ যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে থাকে এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া ও চীন তাদের সামরিক জোট আরও শক্তিশালী করে, তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে বেশি সময় লাগবে না।
বিশ্বের শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর দাবি—ন্যাটোর উচিত কেবল সম্প্রসারণে মনোযোগ না দিয়ে বৈশ্বিক সংকটে রাশিয়ার সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা। অন্যথায়, সামরিক শক্তির এই দম্ভ অদূর ভবিষ্যতে এক অপূরণীয় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ন্যাটো আজ তার ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও বিশ্ব আজ সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থানে। জোটের সম্প্রসারণ যদি যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই সুরক্ষা কার জন্য—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সামরিক শক্তি

