দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ‘পরবর্তী প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করার’ অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৪৫ সালে জন্ম হয়েছিল জাতিসংঘের। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই অঙ্গীকার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উঠেছে তীব্র প্রশ্ন। গাজা থেকে ইউক্রেন, সুদান থেকে মিয়ানমার—রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর মানবিক বিপর্যয়ের মুখে বিশ্বসংস্থাটির ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ ভূমিকা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে।
জাতিসংঘের ব্যর্থতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হচ্ছে এর নিরাপত্তা পরিষদকে (UNSC)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী পাঁচ শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—তাদের সংরক্ষিত ‘ভেটো’ ক্ষমতাকে এখন বিশ্বশান্তির চেয়ে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বেশি ব্যবহার করছে। গত কয়েক বছরে ইউক্রেন আক্রমণ বা গাজা উপত্যকায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ থামাতে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো কার্যকর প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি। একটি দেশ প্রস্তাব আনলে অন্য দেশ ভেটো দিয়ে তা আটকে দিচ্ছে।
এই ‘ভেটো পলিটিক্স’ জাতিসংঘকে একটি অকার্যকর বিতর্ক সভায় পরিণত করেছে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, ব্রাজিল ও আফ্রিকার দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ও স্থায়ী সদস্যপদ দাবি করে আসলেও শক্তিশালী দেশগুলোর অনীহার হিমাগারে পরে আছে।
২০২৬ সালের শুরুতেই জাতিসংঘ এক ভয়াবহ বাজেট সংকটের মুখে পড়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, জাতিসংঘ এখন ‘দেউলিয়া হওয়ার দৌড়ে’ শামিল হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দাতা দেশগুলো তাদের বৈদেশিক সাহায্য নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালে মার্কিন সহায়তা ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে মাত্র ২.৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এর ফলে বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এবং ইউনিসেফ-এর মতো সংস্থাগুলো ফান্ডের অভাবে লাখ লাখ মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছাতে পারছে না। যেখানে সামরিক খাতে বিশ্বের মোট ব্যয় ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, সেখানে মানবিক সহায়তার জন্য মাত্র কয়েক বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে জাতিসংঘকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের কার্যকারিতা হারানোর অন্যতম লক্ষণ হলো আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান অবজ্ঞা। জেনেভা কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) রায়কে এখন আর পরাশক্তিগুলো তোয়াক্কা করছে না। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বা বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতিসংঘের উদ্বেগ কেবল ‘নিন্দা জ্ঞাপনেই’ সীমাবদ্ধ থাকছে। এই ‘ইমপিউনিটি’ বা দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, যদি শক্তিশালী দেশগুলো আইন না মানে, তবে জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। রাজনৈতিকভাবে জাতিসংঘ ব্যর্থ হলেও এর মানবিক শাখাগুলো এখনো বিশ্বকে টিকিয়ে রেখেছে। প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া, খাদ্য সহায়তা প্রদান, উদ্বাস্তু ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
UNDP: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে কাজ করছে।
WHO: বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধান ভূমিকা পালন করছে।
শান্তিরক্ষা মিশন: যদিও অনেক দেশে এই মিশন নিয়ে বিতর্ক আছে, তবুও বহু সংঘাতপ্রবণ এলাকায় তারা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় কাজ করছে।
কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কেবল মানবিক সহায়তা দিয়ে একটি বিশ্বসংস্থা টিকে থাকতে পারে না। সংস্কার না হলে অদূর ভবিষ্যতে জি-৭, ব্রিকস (BRICS) বা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের মতো আঞ্চলিক জোটগুলো জাতিসংঘের শূন্যস্থান দখল করে নিতে পারে।
জাতিসংঘের বয়স এখন ৮০ বছর। ইতিহাস বিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, লিগ অফ নেশনস ঠিক এই বয়সেই অকার্যকর হয়ে বিলুপ্ত হয়েছিল। জাতিসংঘ কি সেই পথেই হাঁটছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘকে প্রাসঙ্গিক রাখতে হলে তিনটি পদক্ষেপ অপরিহার্য: ১. নিরাপত্তা পরিষদের আমূল সংস্কার: উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং ভেটো ক্ষমতার যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। ২. আর্থিক সচ্ছলতা: সদস্য দেশগুলোর নিয়মিত চাঁদা প্রদান নিশ্চিত করা এবং সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। ৩. প্রযুক্তি ও এআই-এর সমন্বয়: আধুনিক যুদ্ধের ধরণ ও সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো।
মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার সাম্প্রতিক ভাষণে বলেছেন, “বিশ্ব এখন বিশৃঙ্খলার মধ্যে আছে। হয় আমরা ঐক্যবদ্ধ হব, না হয় আমরা ধ্বংস হব।” ২০২৬ সাল হবে জাতিসংঘের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষার বছর। সংস্থাটি কি কেবল অতীতের ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে থাকবে, নাকি নতুন বিশ্বের নেতা হিসেবে আত্ম প্রকাশ করবে—তা সময়ই বলে দেবে।

