আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্য-পশ্চিম কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে পুরো দেশ। এতে অন্তত ১১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে বহু বহুতল ভবন, যার নিচে চাপা পড়ে আছেন বহু মানুষ। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বহু বাড়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন। ইতোমধ্যে দেশজুড়ে জাতীয় দুর্যোগ ও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭:৩৪ মিনিটে (১২:৩৪ জিএমটি) এই শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। কলম্বিয়ার জিওলজিক্যাল সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল চোকো (Chocó) প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার গ্রামের কাছে এবং এর গভীরতা ছিল ১০৩ কিলোমিটার। ভূপৃষ্ঠের বেশ গভীরে সৃষ্টি হলেও এর ধ্বংসক্ষমতা ছিল অত্যন্ত প্রখর, যা ছড়িয়ে পড়ে শত শত মাইল জুড়ে।

উৎপত্তিস্থল সান হোসে দেল পালমার এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হলেও অলৌকিকভাবে সেখানকার কোনো বাসিন্দা মারা যাননি বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় মেয়র লিওন ফাবিও মারিন। তবে সবচেয়ে বেশি তছনছ হয়েছে উৎপত্তিস্থল থেকে ৩৫ মাইল দূরের কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ‘পেরেইরা’ শহর।
পেরেইরার বিখ্যাত ‘প্লাজা বলিভার’ স্কয়ারের বেশ কয়েকটি ভবন চোখের সামনে ধসে পড়ে ধুলোয় মিশে যায়। শহরের মেয়রের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, কেবল এই একটি শহরের এলাকাতেই অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬৫টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। এখনও প্রায় ১৫টি ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। বিশৃঙ্খলা এড়াতে শহরের কিছু অংশে নৈশকালীন সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করা হয়েছে।
এছাড়া ‘কালি’ শহরে অন্তত ৩২টি ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। এর বাইরে মানিজালেস, কিবদো, মেদেয়িন এবং ভেল দেল কাউকা অঞ্চলেও ব্যাপক প্রাণহানির খবর আসছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, কম্পন শুরু হতেই মানুষজন আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসেন। মানিজালেস শহরের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “চারপাশ থেকে শুধু চিৎকার আর ইট-পাথর খসে পড়ার শব্দ আসছিল। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।” তবে মানিজালেসে কড়া ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণ নীতি থাকার কারণে সেখানকার অনেক বড় ভবন বড় ধরণের ধস থেকে রক্ষা পেয়েছে।

ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, রাজধানী বোগোতার বড় বড় ভবন, ট্রাফিক লাইট ও গাছপালা মারাত্মকভাবে দুলতে থাকে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর এবং পানামাতেও শক্তিশালী ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে।
নতুন দায়িত্ব নেওয়া কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলিয়ার্ডো দে লা এস্প্রিয়েলা দেশে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, প্রাথমিক হিসাবে দেড় হাজারের বেশি বাড়িঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনা ও দ্রুত বাজেট পুনর্নির্ধারণের জন্য সরকার বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এদিকে এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের ‘কোপার্নিকাস’ স্যাটেলাইট প্রযুক্তি দিয়ে উদ্ধারকাজে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এবং এল সালভাদরের মতো দেশগুলো উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এই তীব্র কম্পন সরাসরি অনুভব করেছেন। উৎস গভীরে হওয়ায় ভূ-পৃষ্ঠে সরাসরি ফাটল কম হলেও, এর শক্তিমত্তা ভবনগুলোর অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী ‘আফটার শক’ বা অনুকম্পনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।

