ইরাক ও জর্ডানে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইরাকে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর একাধিক শক্তঘাঁটিতে বুধবার ভোরে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। অন্যদিকে, এর জবাবে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করে একযোগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
সম্প্রতি টানা ১৩ দিন বোমাবর্ষণের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সাময়িক হামলা বন্ধ ঘোষণা করেছিল এবং ইরানও তাদের পাল্টা পদক্ষেপ স্থগিত করেছিল। তবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই পক্ষের নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

ইরাকে মার্কিন-সৌদি যৌথ হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি
সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার জবাবে ওয়াশিংটন ও রিয়াদ এই যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরব মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত হলো।
- হতাহতের সংখ্যা: পিএমএফ জানিয়েছে, বাগদাদ, বসরা, কিরকুক, নিনেভে ও কারবালাসহ বেশ কয়েকটি প্রদেশের ঘাঁটিতে চালানো এই হামলায় তাদের অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত ও ৩২ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
- ইরাকের প্রতিক্রিয়া: দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলী আল–জাইদি।
- ইরানের বক্তব্য: এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তেহরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এই আগ্রাসন পুরো অঞ্চলকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাত ও ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি
ইরাকে হামলার প্রায় সমসময়ে জর্ডানে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারেও হামলার দাবি করেছে তেহরান।
সেন্টকম এবং জর্ডান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করা হয়েছে। জর্ডানে মোতায়েন থাকা প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনার নিরাপত্তায় মুঠোফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করছে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ।
এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফক্স নিউজকে জানান, জর্ডানের হামলার জন্য ইরানকে ‘চড়া মূল্য দিতে হবে’। তিনি পিএমএফ-এর মতো গোষ্ঠীগুলোকে বিশ্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেন।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আঞ্চলিক শঙ্কা
হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধ পরিহার করে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ দুই পক্ষকেই ইতিপূর্বে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন।
তবে ওমানের দেওয়া হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনার প্রস্তাব ইরান প্রত্যাখ্যান করায় এবং হরমুজ ও লোহিত সাগরে অস্থিরতা বাড়ায় বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন—কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি এই সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।

