Saturday, May 9, 2026
26.9 C
Bangladesh

অ্যাপল নাকি কোয়ালকম, কার চিপসেটের এগিয়ে ?



বাজারে ফোনের অভাব নেই,তার সাথে পাল্লা দিয়ে আপডেট হচ্ছে ফোনের চিপসেটে।
প্রযুক্তি বিশ্বে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরেভফিরে আসছে—স্মার্টফোনের প্রসেসরের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে? একদিকে অ্যাপলের নিজস্ব ‘A’ সিরিজের সিলিকন, যা বছরের পর বছর ধরে অপ্টিমাইজেশন আর পারফরম্যান্সে আভিজাত্য বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, কোয়ালকমের স্ন্যাপড্রাগন, যা অ্যান্ড্রয়েড জগতের শক্তিশালী ফ্ল্যাগশিপগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পরবর্তী প্রজন্মের চিপসেট—অ্যাপলের সম্ভাব্য A20 Bionic (বা পরবর্তী সংস্করণ) এবং কোয়ালকমের Snapdragon 8 Gen 5 নিয়ে কথা বলছি, তখন লড়াইটা কেবল গিগাহার্টজ বা ন্যানো মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখনকার লড়াই মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), জেনারেটিভ টাস্ক এবং ব্যাটারি লাইফের ভারসাম্য রক্ষার। চিপের পারফরম্যান্সের মূলে থাকে এর নির্মাণ প্রক্রিয়া। অ্যাপল এবং কোয়ালকম উভয়ই এখন টিএসএমসি (TSMC)-এর উন্নত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। অ্যাপল তাদের ‘A’ সিরিজের পরবর্তী চিপে ২-ন্যানোমিটার (2nm) বা আরও উন্নত ৩-ন্যানোমিটার নোড ব্যবহার করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কোয়ালকম তাদের নিজস্ব ‘ওরিয়ন’ (Oryon) কোরের ওপর ভিত্তি করে স্ন্যাপড্রাগনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অ্যাপলের শক্তি হলো তাদের ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন। তারা জানে তাদের হার্ডওয়্যার ঠিক কোন সফটওয়্যারের (iOS) সাথে কাজ করবে। ফলে কম ট্রানজিস্টর দিয়েও তারা যে পারফরম্যান্স বের করে আনতে পারে, কোয়ালকমকে সেই একই স্তরে পৌঁছাতে অনেক বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। তবে কোয়ালকম এখন তাদের কাস্টম কোরের মাধ্যমে অ্যাপলের সেই একক আধিপত্যে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে, সিঙ্গেল কোর পারফরম্যান্সে অ্যাপল বরাবরই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আপনি যদি ভিডিও এডিটিং বা হাই-রেজোলিউশন রেন্ডারিংয়ের মতো কাজ করেন, তবে অ্যাপলের চিপগুলো এখনো কিছুটা এগিয়ে থাকে। বিশেষ করে ল্যাটেন্সি বা অ্যাপ রেসপন্স টাইমে অ্যাপলের ‘A’ সিরিজ একটি মসৃণ অভিজ্ঞতা দেয়।

তবে গ্রাফিক্স বা জিপিইউ (GPU) বিভাগে কোয়ালকম গত কয়েক বছরে অবিশ্বাস্য উন্নতি করেছে। গেমিং পারফরম্যান্স এবং রে-ট্রেসিং (Ray Tracing) প্রযুক্তিতে স্ন্যাপড্রাগন এখন অ্যাপলকে কড়া টক্কর দিচ্ছে। আপনি যদি একজন হার্ডকোর মোবাইল গেমার হন, তবে স্ন্যাপড্রাগনের লেটেস্ট চিপের গ্রাফিক্স রেন্ডারিং ক্ষমতা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
২০২৪-২৫ সাল থেকেই স্মার্টফোন চিপের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে এনপিইউ (NPU) বা নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট। বর্তমানে আমরা কেবল ফোন দিয়ে ছবি তুলি না বা কল করি না; আমাদের ফোন এখন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে টেক্সট লিখছে, ইমেজ এডিট করছে এবং রিয়েল-টাইম ট্রান্সলেশন করছে।

অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স: অ্যাপল তাদের পরবর্তী চিপে অন-ডিভাইস এআই-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীর প্রাইভেসি বজায় রেখে ফোনের ভেতরেই সব জটিল এআই ক্যালকুলেশন সম্পন্ন করা।

কোয়ালকমের এআই ইঞ্জিন: কোয়ালকমের সুবিধা হলো তাদের ওপেন ইকোসিস্টেম। তারা বিভিন্ন থার্ড পার্টি অ্যাপ ডেভেলপারদের সাথে মিলে এমনভাবে চিপ ডিজাইন করছে যাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলো এআই টাস্কে আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। বিশেষ করে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) রান করার ক্ষেত্রে স্ন্যাপড্রাগন বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিযোগী।

পাওয়ারফুল চিপ মানেই বেশি তাপ উৎপন্ন হওয়া। এখানে অ্যাপল অনেকটা এগিয়ে থাকে তাদের চিপের চমৎকার এনার্জি এফিসিয়েন্সির কারণে। আইফোনের ব্যাটারি অ্যান্ড্রয়েড ফ্ল্যাগশিপগুলোর তুলনায় ছোট হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যাকআপ দেয়, তার মূল কৃতিত্ব এই ‘A’ সিরিজের চিপের।

কোয়ালকম যদিও তাদের লেটেস্ট জেনারেশনে হিটিং ইস্যু অনেক কমিয়ে এনেছে, তবুও দীর্ঘক্ষণ গেমিং বা হাই-লোড কাজের সময় স্ন্যাপড্রাগন চালিত ফোনগুলো কিছুটা বেশি গরম হতে পারে। তবে ফাস্ট চার্জিং সাপোর্টের ক্ষেত্রে কোয়ালকম অ্যাপলকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।
বেঞ্চমার্ক স্কোর দিয়ে সব সময় আসল পারফরম্যান্স বোঝা যায় না। কাগজে-কলমে হয়তো অ্যাপলের স্কোর বেশি, কিন্তু বাস্তব জীবনে একজন সাধারণ ব্যবহারকারী স্ন্যাপড্রাগন এবং অ্যাপল চিপের মধ্যে পার্থক্য খুব একটা ধরতে পারবেন না। অ্যাপল যেখানে স্থিতিশীলতা (Stability) দেয়, কোয়ালকম সেখানে বহুমুখিতা (Versatility) এবং কাস্টমাইজেশনের সুযোগ দেয়।
সার্বিকভাবে বলতে গেলে, যদি আপনার অগ্রাধিকার হয় সফটওয়্যার-হার্ডওয়্যার অপ্টিমাইজেশন, দীর্ঘমেয়াদী আপডেট এবং ভিডিও প্রোডাকশন, তবে অ্যাপলের পরবর্তী ‘A’ সিরিজের চিপ আপনার জন্য সেরা। এটি একটি লং-টার্ম ইনভেস্টমেন্টের মতো।

অন্যদিকে, আপনি যদি গেমিং, অত্যাধুনিক কানেক্টিভিটি এবং বহুমুখী এআই ফিচারের ভক্ত হন, তবে কোয়ালকমের স্ন্যাপড্রাগন আপনাকে বেশি সন্তুষ্ট করবে।

লড়াইটা এখন আর ‘কে ভালো’ তা নিয়ে নয়, বরং লড়াইটা হলো ‘কে আপনার প্রয়োজনটা ভালো বোঝে’ তা নিয়ে। তবে বর্তমান ট্রেন্ড বলছে, কোয়ালকম যেভাবে দ্রুতগতিতে অ্যাপলের গ্যাপ পূরণ করছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে অ্যাপলের জন্য সিংহাসন ধরে রাখাটা বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আমাদের মতামত: স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রির এই দুই জায়ান্টে লড়াইয়ের সুফল ভোগ করছি আমরা সাধারণ ব্যবহারকারীরা। কারণ এই প্রতিযোগিতার ফলেই আমরা প্রতি বছর আরও শক্তিশালী এবং দক্ষ স্মার্টফোন হাতে পাচ্ছি। পরবর্তী প্রজন্মের এই চিপগুলো আমাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে যে আমূল বদলে দেবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...