Tuesday, August 11, 2026
26.7 C
Bangladesh

বিশ্বায়ন ও শিক্ষা: একুশ শতকের ‘স্বর্ণযুগে’ আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থা

গত চার দশকে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু যে পরিবর্তনটি নিঃশব্দে অথচ গভীরভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছে, তা হলো ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষা’র বিবর্তন। সত্তরের দশকে যা ছিল কেবল গুটিকায়ক তাত্ত্বিক ও ভ্রমণপিয়াসী পণ্ডিতদের আলোচনার বিষয়, আজ তা এক বিশাল বৈশ্বিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষা আর কোনো শৌখিন গবেষণা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে বাস্তব প্রয়োগ ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন আন্তর্জাতিক শিক্ষা পড়ানো হতো, তখন এর ভিত্তি ছিল মূলত হোরাস মান বা ম্যাথিউ আরনল্ডের মতো পর্যটকদের অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে আইজ্যাক ক্যান্ডেল বা জর্জ বেরেডের মতো পণ্ডিতরা একে একটি পদ্ধতিগত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।

সেই সময় শিক্ষা ছিল সমাজবিজ্ঞানের একটি অংশ মাত্র। কিন্তু বর্তমান সময়ে ফিলিপ ফস্টার বা জেমস কোলম্যানদের দেখানো পথে হেঁটে শিক্ষা এখন অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক সময় ধারণা করা হতো, প্রতিটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তার নিজস্ব সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু একুশ শতকের শুরুতে দেখা যাচ্ছে, গণিত, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোতে বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরি হয়েছে।

তথ্যের বিস্ফোরণ ও চাহিদার পরিবর্তন পরিসংখ্যান বলছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার ওপর প্রকাশনার হার বিস্ময়করভাবে বেড়েছে। সত্তরের দশকে যেখানে পাবলিক পলিসি ইস্যুতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার ওপর মাত্র ৩৪টি এন্ট্রি ছিল, দশ বছর পরেই তা বেড়ে ১৫৫টিতে দাঁড়ায়। বর্তমানে বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো এবং ইউনিসেফের মতো সংস্থাগুলো প্রতি বছর শত শত রিপোর্ট প্রকাশ করছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর ও যুবকদের ওপর ৩,০০০ গবেষণা প্রকল্পের মধ্যে মাত্র একটি ছিল আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক। অথচ ১৯৮৩ সালে ‘এ নেশন অ্যাট রিস্ক’ (A Nation at Risk) রিপোর্ট প্রকাশের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারেন যে, বিশ্বমানের সাথে পাল্লা দিতে হলে আন্তর্জাতিক তথ্য ও গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষাকে কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি একটি ‘ট্রেডেড সার্ভিস’ বা বাণিজ্যিক সেবা। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা দেশটির পঞ্চম বৃহত্তম সেবা রপ্তানি খাত। ২০০১ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাবদ আয় ছিল প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার।

তবে এই দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একা নয়। ১৯৯০ সালে যেখানে বিশ্বের ৪০ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যেত, এখন তা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ফ্রান্স এই বাজারে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডে মোট শিক্ষার্থীর ১৬ শতাংশই আন্তর্জাতিক, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার মাত্র ৩.৯ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার এই প্রসারের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে:

১. অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন: বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন বিনিয়োগ করার আগে দেখে সেই দেশের শ্রমশক্তির শিক্ষার মান কেমন। ভারত, মেক্সিকো বা চিলিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থার দক্ষতা সরাসরি প্রভাব ফেলে।
২. গণতন্ত্রের প্রসার: নতুন গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে শিক্ষা নীতি নিয়ে জনস্মুখে বিতর্ক হচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারকরা অন্য দেশের সফল মডেলগুলো অনুসরণ করতে আগ্রহী হচ্ছেন।
৩. আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধন: সীমিত বাজেটে কীভাবে উন্নত শিক্ষা দেওয়া যায়, তা শিখতে দেশগুলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। নেদারল্যান্ডস ও রাশিয়ার মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা এর একটি বড় উদাহরণ।

একুশ শতককে আন্তর্জাতিক শিক্ষার ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হলেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষা সহায়তা কমে যাচ্ছে। তবুও তথ্য ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান থামেনি। ওecd-এর ‘এডুকেশন ইন্ডিকেটর’ এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকাশনা। চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো এখন বৈশ্বিক শিক্ষা মানদণ্ড নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার এই আন্তর্জাতিকীকরণ কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়, এটি গুণগতও। এখন আর কেউ শুধু ‘কে কার চেয়ে ভালো’ তা জানতে চায় না, বরং ‘কীভাবে শেখানো হচ্ছে’ বা ‘শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি কী’—এসব গভীরতর বিষয়ে তথ্য বিনিময় হচ্ছে। কম্পিউটার লিটারেসি বা নৈতিক শিক্ষার মতো বিষয়গুলোতে দেশগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা আজ আর কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নেই। এটি এখন স্থানীয় ও বৈশ্বিক চাহিদার এক জটিল সংমিশ্রণ। আমরা এমন এক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে একজন শিক্ষার্থীর যোগ্যতা কেবল তার দেশের সার্টিফিকেটে নয়, বরং বৈশ্বিক মানদণ্ডে পরিমাপ করা হবে। উচ্চশিক্ষা আজ আর অভিজাতদের বিলাসিতা নয়, এটি গণমানুষের অধিকার এবং রাষ্ট্রের টিকে থাকার লড়াই।

তথ্যসূত্র:
১.University of Chicago Archives (1970s Course Readings on International Education).

২.The National Commission on Excellence in Education (1983). “A Nation at Risk”.

৩.OECD (2001). “Education at a Glance” Indicators.

৪.World Bank Education Sector Reports (1972-1992).

৫.U.S. Department of Commerce: International Trade in Services Data.

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...