মানুষ কেন মারা যায়? আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সহজ প্রশ্ন মনে হলেও এর উত্তর লুকিয়ে আছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বিশাল গবেষণাপত্র এবং পরিসংখ্যানের জটিল জালে। আধুনিক বিশ্বে মৃত্যুর কারণগুলো কেবল ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়, বরং একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দর্পণ। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, মৃত্যুর কারণগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীজুড়ে মানবমৃত্যুর ধরণ এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মৃত্যুর কারণগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— ১.’প্রক্সিমেট’ বা তাৎক্ষণিক কারণ এবং 2.’নন-প্রক্সিমেট’ বা পরোক্ষ কারণ।
প্রক্সিমেট কারণ হলো সেই রোগ বা অবস্থা যা সরাসরি মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, যেমন হৃদরোগ, ক্যান্সার বা স্ট্রোক। অন্যদিকে, নন-প্রক্সিমেট কারণগুলো হলো সেই সব অভ্যাস বা পরিবেশগত বিষয় যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, তামাক সেবন একটি নন-পরোক্ষ কারণ যা ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো প্রত্যক্ষ কারণ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে জীবনযাত্রার ধরন বা লাইফস্টাইলজনিত মৃত্যু সবচেয়ে বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এবং শরীরচর্চার অভাব প্রত্যক্ষ বা প্রক্সিমেট মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মৃত্যুর বৈশ্বিক ভাষা পৃথিবীর প্রতিটি কোণে মৃত্যুর ধরণ যেন এক সূত্রে গাঁথা যায়, সে জন্য ১৯৪৬ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অফ ডিজিজেস’ বা আইসিডি (ICD) নামক একটি কোডিং সিস্টেম ব্যবহার করছে। বর্তমানে এর ১০ম সংস্করণ (ICD-10) কার্যকর রয়েছে, যেখানে মৃত্যুকে ১৭টি প্রধান শ্রেণিতে এবং প্রায় ৮,০০০ উপ-শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এই পদ্ধতি গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করে যে কোন নতুন রোগ (যেমন এইচআইভি বা আলঝেইমার্স) মানবজাতির জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বৈষম্যের চিত্র মৃত্যুর পরিসংখ্যানে উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে এক প্রকট বৈষম্য ধরা পড়ে। উন্নত দেশগুলোতে মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো বার্ধক্যজনিত বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যেমন হৃদরোগ এবং ক্যান্সার। সেখানে মোট মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঘটে এই কারণে।
অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে সংক্রামক ব্যাধি, পরজীবী ঘটিত রোগ এবং প্রসবকালীন জটিলতা এখনো বড় ঘাতক। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই দেশগুলোতে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৩ শতাংশ ঘটে সংক্রামক রোগের কারণে এবং ১০ শতাংশ ঘটে মা ও শিশু মৃত্যুর মতো প্রসবকালীন জটিলতায়। উন্নত দেশে এই হার মাত্র ১ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে, সম্পদের সঠিক বণ্টন ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ।
১৯৭১ সালে গবেষক ওমরা প্রস্তাব করেছিলেন ‘এপিডেমিওলজিক ট্রানজিশন’ বা রোগতাত্ত্বিক বিবর্তনের তত্ত্ব। তাঁর মতে, মানবসমাজ তিনটি ধাপ অতিক্রম করে। প্রথম ধাপ হলো ‘মহামারি ও দুর্ভিক্ষের যুগ’, যেখানে মানুষ মূলত পুষ্টিহীনতা ও সংক্রামক রোগে মারা যায়। দ্বিতীয় ধাপ হলো ‘মহামারি হ্রাসের যুগ’, যেখানে স্যানিটেশন ও ওষুধের উন্নতির ফলে মৃত্যুর হার কমে। এবং বর্তমানের তৃতীয় ধাপ হলো ‘ degenerative’ বা ক্ষয়িষ্ণু রোগের যুগ, যেখানে মানুষ মূলত ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে মারা যায়।
তবে বর্তমান যুগে এই তত্ত্ব নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে যেমন হৃদরোগের মতো রোগগুলো বার্ধক্যকে পিছিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে করোনা বা এইচআইভির মতো নতুন সংক্রামক ব্যাধিগুলো বিজ্ঞানীদের পুনরায় ভাবিয়ে তুলছে। এমনকি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া (Superbugs) এবং বায়ো-টেররিজম ভবিষ্যতে মৃত্যুর কারণগুলোকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। অনুন্নত দেশগুলোতে অধিকাংশ মৃত্যুর সঠিক রেকর্ড রাখা হয় না। অনেক সময় ডাক্তার বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের অভাবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অস্পষ্ট থেকে যায়। তথাকথিত ‘ভারবাল অটোপসি’ বা স্বজনদের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি পরিসংখ্যান অনেক সময় সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারে না। আবার, একই ব্যক্তির একাধিক রোগ থাকলে কোনটিকে ‘মূল কারণ’ ধরা হবে, তা নিয়েও চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিতর্ক বিদ্যমান।
আশার কথা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রায় ৫০ শতাংশ মৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য। তামাক বর্জন, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম এবং অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ করলে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন আমাদের গড় আয়ু বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে, মৃত্যুর কারণ নিয়ে গবেষণা কেবল সংখ্যাতত্ত্ব নয়, এটি বেঁচে থাকার এক নতুন পথনকশা। স্বাস্থ্য সম্পদের সঠিক বণ্টন এবং ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে পৃথিবীকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে।
তথ্যসূত্র:
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO): ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অফ ডিজিজেস (ICD-10)।
২. এলেন এম. গি: ম্যাকমিলান এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ডেথ অ্যান্ড ডাইং।
৩. ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিস্টিকস (NCHS): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুর কারণ বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন।
৪. ওমরা, এ. আর. (১৯৭১): দ্য থিওরি অফ এপিডেমিওলজিক্যাল ট্রানজিশন।
৫. ম্যাকগিনিস ও ফোগে (১৯৯৩): একচুয়াল কজেস অফ ডেথ ইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস (JAMA)।

