পৃথিবীর বুকে মানুষের পদচারণা আজ থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ বছর আগের। পূর্ব আফ্রিকার সাভানা অঞ্চলে যখন Homo habilis নামক এক আদিম প্রজাতি পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার শুরু করেছিল, তখন তারা জানত না যে একদিন তাদের উত্তরসূরিরাই এই গ্রহের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠবে। মাত্র ১ লক্ষ মানুষের একটি ছোট গোষ্ঠী থেকে আজকের ৮ বিলিয়নের এই বিশাল জনসমুদ্র—এই যাত্রার প্রতিটি বাঁক মানব বুদ্ধিবৃত্তি এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প বলে।
নৃতাত্ত্বিক ও জনতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, আদিম মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল অত্যন্ত ধীর। প্রায় ৩০ লক্ষ বছর আগে যখন মানুষের মস্তিষ্কের আকার ৫০০ গ্রামের কম ছিল, তখন থেকে শুরু করে পরবর্তী বিবর্তনে তা ১ কেজির বেশি বৃদ্ধি পায়। এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশই মানুষকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করে। Homo erectus-এর আমলে বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৫ লক্ষ থেকে ৭ লক্ষের মধ্যে।
পরবর্তীতে Homo sapiens বা আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটলে চিত্রপট বদলাতে শুরু করে। প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে শেষ তুষারযুগের শুরুতে মানুষ অস্ট্রেলিয়া, সাইবেরিয়া এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ লক্ষের মতো, যার সিংহভাগই ছিল এশিয়া ও আফ্রিকায়।
জনসংখ্যা বিস্ফোরণের প্রথম সোপান
জনসংখ্যা বৃদ্ধির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ৮,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যখন মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে কৃষি ও পশুপালনে অভ্যস্ত হয়। একে বলা হয় ‘নিওলিথিক বিপ্লব’।
কৃষির প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জনসংখ্যা ২ লক্ষ থেকে বেড়ে ৫০ লক্ষে পৌঁছায়। ইউরোপে ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জনসংখ্যা ছিল ২০ লক্ষ, যা ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ২৩ লক্ষে উন্নীত হয়।ভারতীয় উপমহাদেশে ঐতিহাসিক ভাবেই জনবহুল। ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এখানে ৩ মিলিয়ন মানুষ থাকলেও ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তা ২০ থেকে ২৫ মিলিয়নে গিয়ে ঠেকে।চিনের হোয়াং-হো নদীর অববাহিকায় কৃষি সভ্যতা বিস্তারের ফলে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ জনসংখ্যা ২০ মিলিয়নে পৌঁছায়।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি সবসময় রৈখিক বা মসৃণ ছিল না। জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্ভিক্ষ এবং বিশেষ করে সংক্রামক ব্যাধি জনসংখ্যার চাকাকে বারবার পেছনে টেনে ধরেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপের জনসংখ্যাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। তেমনিভাবে আফ্রিকা মহাদেশে দাসপ্রথার কারণে দীর্ঘকাল জনসংখ্যা স্থবির হয়ে ছিল। প্রায় ১ কোটি মানুষকে আমেরিকায় এবং ৪০ লক্ষ মানুষকে মুসলিম দেশগুলোতে দাস হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়ায় আফ্রিকার স্বাভাবিক জনমিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে শুরু হওয়া শিল্প বিপ্লব জনমিতির ইতিহাসে তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় ঢেউ নিয়ে আসে। এই সময়েই মানুষ বুঝতে পারে যে মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৮০০ সালে যেখানে গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩৫ বছর, সেখানে ২০০০ সালে তা ৭৫ বছরে উন্নীত হয়েছে।
বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক এবং টিকার আবিষ্কার শিশুমৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে। ফলে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনসংখ্যার একটি বিশাল ‘তরুণ প্রজন্ম’ তৈরি হয়।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হলো প্রজনন হার। মজার বিষয় হলো, ফ্রান্সে ১৭০০ সালের দিকেই স্বেচ্ছায় জন্মনিয়ন্ত্রণ শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তী ১০০ বছরে নারীর প্রতি গড় সন্তান সংখ্যা ৬ থেকে ৩-এ নামিয়ে আনে। জাপানেও একই ধরণের অভিজ্ঞতা দেখা যায়। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এই পরিবর্তন এসেছে অনেক পরে। বর্তমানে ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া এবং মুসলিম দেশগুলোতেও প্রজনন হার দ্রুত কমছে।
একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব জনসংখ্যা ৬ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৯ বিলিয়নে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, প্রজনন হার হ্রাসের ফলে এই বৃদ্ধির গতি এখন অনেক মন্থর। উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণ সমাজ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং শিক্ষিত, যা আগামীতে একটি স্থিতিশীল জনসংখ্যা কাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
মানবজাতির এই দীর্ঘ ভ্রমণ প্রমাণ করে যে, আমরা কেবল প্রকৃতির অংশ নই, বরং প্রকৃতিকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখি। তবে এই বিশাল জনসমষ্টির অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের সংস্থান করতে গিয়ে আমরা পৃথিবীর যে ক্ষতি করছি, তা মোকাবিলা করাই এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্রঃ
১. Biraben, Jean-Noël (1979). “Essai sur l’évolution du nombre des hommes.”
২. McEvedy, Colin & Jones, Richard (1978). Atlas of World Population History.
৩. United Nations (2001). World Population Prospects: The 2000 Revision.
৪. Durand, John D. (1977). “Historical Estimates of the World Population: An Evaluation.”
৫. Das Gupta, Ajit (1972). “Study of the Historical Demography of India.”

