Friday, May 8, 2026
33.2 C
Bangladesh

স্বাধীনতার সূর্যোদয় থেকে ২০২৬-এর গণতন্ত্রের নবযাত্রা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ৫৪ বছরের পথচলা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, নাটকীয় এবং সংঘাতপূর্ণ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে আজকের ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন পর্যন্ত—দেশটি বহু চড়াই-উতরাই পার করেছে।

১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি কখনো গণতন্ত্রের সুশীতল বাতাস পেয়েছে, আবার কখনো সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারের কবলে পড়েছে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন নতুন এক সংসদীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে, তখন পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় এক উত্তাল দীর্ঘ ইতিহাস।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। ১৯৭২ সালে প্রণীত হয় একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখে ১৯৭৫ সালের শুরুতে প্রবর্তিত হয় একদলীয় ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা। কিন্তু সেই বছরেরই ১৫ আগস্ট ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে ঘুরিয়ে দেয়।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন সামরিক কর্মকর্তারা। ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে  তিনিও নিহত হন। এরপর ১৯৮২ সালে লে. জেনারেল এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। দীর্ঘ নয় বছর তার শাসনামল ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। 

এরপর সূচনা হয় গণতান্ত্রিক যুগ ও ‘দুই নেত্রীর’ লড়াই (১৯৯১–২০০৬)। ১৯৯১ সালে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে বাংলাদেশ। এরপর শুরু হয় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পালাবদল করে দেশ শাসনের এক নতুন অধ্যায়। ১৯৯১-৯৬ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চলে বিএনপি সরকারের শাসন। তারপর ১৯৯৬-২০০১ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের জয় এবং দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। ২০০১-২০০৬ বিএনপি-জামায়াত জোটের পুনরুত্থান ঘটে। এই সময়কালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও দুই প্রধান দলের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও রাজপথের সংঘাত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক।

তারপর সূচনা হয় ওয়ান-ইলেভেন ও আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন (২০০৭–২০২৪)। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সুযোগে সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে আবারো ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ সরকার। তবে পরবর্তী ১৫ বছর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও বিরোধী দলের বয়কট দেশের রাজনৈতিক সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করে। শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে অভাবনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন (যেমন: পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র) হলেও মানবাধিকার এবং বিরোধী দল দমনের অভিযোগ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকার রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং গত ১৫ বছরের অনিয়মের বিচারের দায়িত্ব নেয়। 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সংসদীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর আমূল সংস্কার ও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের এক অগ্নিপরীক্ষা ছিল। ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি দু’দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে। 

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকেও বুঝতে হবে রাজনীতি যদি মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক হয়, তবে তা শুধু ঢাকার পিচঢালা রাস্তায় নয়, প্রতিটি ইউনিয়নের মাটির পথে প্রতিফলিত হতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের নতুন রাজনীতির স্বপ্ন। ৫৪ বছরের এই দীর্ঘ ভ্রমণে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে—এ দেশের মানুষ বারবার সংকটে ঘুরে দাঁড়াতে জানে। ভোট শুধু একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজনীতি যেন একটি দূরবর্তী বিষয় নাহয়ে থাকে, শুধু খবরের কাগজে নাথাকে, জীবনের ভেতরে যেন তা প্রবেশ করে।

(তথ্য সংগ্রহ ও লেখা, রাকিবুল ইসলাম রাফি, এপিক ভার্স জার্নাল)

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...