আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রায় দেড় বছর মেয়াদী অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনের পর এই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে ভোটগ্রহণের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ভোটগ্রহণ শেষে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলের মধ্যে ফলাফল স্পষ্ট হতে শুরু করবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে যারা আত্মপ্রকাশ করবে, তারা আগামী ৫ বছরের জন্য বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। ১২ তারিখের পর দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি ‘নির্বাচিত সরকার’ ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এর আগে আইসিজের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বাংলাদেশের দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তির একটি—শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। দলটির সারা দেশে শক্তিশালী সাংগঠনিক বিস্তৃতি ও ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক বছরে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের ধারণা, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
অপর দিকে নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটি ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার হয়। তবে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে জামায়াতের ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় ভূমিকার কারণে দলটি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। দলটির আমির শফিকুর রহমান সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান ও গণহত্যায় সম্পৃক্ততার মতো বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে তরুণদের অনেকের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।
১২ তারিখের পর পরিস্থিতি শান্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে, তবুও ফলাফল পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক উত্তাপ বা বিজয় মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক সহিংসতা রুখতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের প্রধান নজর থাকবে অর্থনীতির ওপর। ১২ তারিখের পর যে নতুন সরকারই আসুক না কেন, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর দেশে বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতা কাটবে।
১২ তারিখের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলোর সাথে নতুন সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারণে নির্বাচনের পরবর্তী কয়েক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সাথে ক্রিকেট সম্পর্ক পুনরুদ্ধার বা ভারতের সাথে সীমান্ত ও পানি চুক্তির মতো বিষয়গুলো নতুন সরকারের টেবিলে অগ্রাধিকার পাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রশাসনিক ও বিচারিক সংস্কারের সূচনা করেছে, ১২ তারিখের পর নির্বাচিত সরকার সেগুলো কতটা বজায় রাখবে তা একটি বড় প্রশ্ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যাংকিং সেক্টরে সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চাপ বজায় থাকবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির পর বাংলাদেশ একটি ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ’-এর পথে হাঁটবে। তবে দীর্ঘদিনের মেরুকরণ কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে পরবর্তী সরকারের মূল পরীক্ষা।

