২০২৬ সাল বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে কেবল একটি সাধারণ বছর নয়, বরং এটি একটি ‘রূপান্তরের বছর’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আমূল পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে। যে বিশ্ব একসময় এককেন্দ্রিক ছিল, তা এখন স্পষ্টত বহুমেরুকেন্দ্রিক (Multipolar) হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালে বিশ্ব রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ এবং শুল্ক নীতির কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক দূরত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ন্যাটোর (NATO) ওপর মার্কিন নির্ভরতা কমানোর ঘোষণা ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে বাধ্য করছে।
২০২৬ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। চীন এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং তারা ‘ইলেক্ট্রোস্টেট’ (Electrostate) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজারে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে শীতল লড়াই চলছিল, তা এখন সাইবার যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অবরোধের রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক মহড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় এই অঞ্চলটি যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান এবং অন্যদিকে সৌদি আরবের নিজস্ব অর্থনৈতিক রূপান্তর (Vision 2030) অঞ্চলটিতে নতুন জোট তৈরি করছে। প্রথাগত তেলের রাজনীতির বদলে এখন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সাল নাগাদ ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমলেও শান্তি চুক্তি এখনো অধরা। ইউক্রেন তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারলেও আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিয়ে রাশিয়ার সাথে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে আটকা পড়েছে। এর ফলে ইউরোপে সামরিক ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জার্মানি এবং ফ্রান্স এখন ইউরোপের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা গত ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথম।
২০২৬ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশেষ করে ভারত নিজেকে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি (Balancing Power) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্রিকস (BRICS) প্লাস জোটের সম্প্রসারণ পশ্চিমা জি-৭ (G7) জোটের আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অনুসারী নয়, বরং তারা নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে।
২০২৬ সালের ভূ-রাজনীতির একটি বড় অংশ দখল করে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এখন দেশগুলো কেবল সীমানা রক্ষার জন্য লড়াই করছে না, বরং ‘ডেটা সার্বভৌমত্ব’ রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। যে দেশের কাছে উন্নত এআই মডেল এবং সুপার কম্পিউটিং ক্ষমতা আছে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতি ও সামরিক কৌশল নিয়ন্ত্রণ করছে। এআই-এর অপব্যবহার এবং ডিপফেক প্রযুক্তি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলার বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি এখন একটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র। দুর্লভ খনিজ সম্পদ (Critical Minerals) যেমন লিথিয়াম ও কোবাল্ট দখলের জন্য আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। পানি সংকটকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নতুন সীমান্ত উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতিতে অনিশ্চয়তাই একমাত্র ধ্রুব সত্য। একদিকে প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি, অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির (New START) মেয়াদ শেষ হওয়া বিশ্বকে এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, দুবাইয়ের ‘ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্টস সামিট’ বা জাতিসংঘের লিডারস সামিটে দেশগুলো বৈশ্বিক সংকট সমাধানে সংলাপে বসার চেষ্টা করছে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সাল হবে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের বছর। একক কোনো দেশ নয়, বরং আঞ্চলিক জোট এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্ব কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

