বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নামগুলোর একটি হলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ‘দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার’ অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংস্থাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটা স্বচ্ছতা আনতে পেরেছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ব্যবধান যেন ক্রমেই বাড়ছে।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ
২০০৪ সালে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দুদক গঠিত হলেও এর কার্যক্রমের ওপর বারবার রাজনৈতিক ছায়া পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুদকের অতি-সক্রিয়তা এবং ক্ষমতাসীনদের আমলে স্থবিরতা সংস্থাটির নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুদক যখনই বিরোধী শিবিরের নেতাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠায়, তখনই একটি গোষ্ঠী একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে অভিহিত করে। অন্যদিকে, সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকলেও দুদকের ‘ধীরগতি’ বা ‘ক্লিন চিট’ দেওয়ার প্রবণতা জনমনে হতাশা সৃষ্টি করে।
যে বিষয়গুলো দুদকের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে:
তদন্তের মন্থর গতি: অনেক হাই-প্রোফাইল নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ থাকলেও তদন্ত শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষেত্রে আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতা দুদকের হাতকে সংকুচিত করে রাখে।
একপাক্ষিক অভিযান: জনগণের একটি বড় অংশের ধারণা, দুদক কেবল ‘দুর্বল’ বা ‘সাবেক’ ক্ষমতাশালীদের ওপর খড়্গহস্ত, কিন্তু বর্তমানের বড় রাঘববোয়ালদের স্পর্শ করতে তারা দ্বিধান্বিত।
স্বচ্ছতা ফেরানোর পথ কী?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুদককে কেবল কাগজে-কলমে স্বাধীন হলে চলবে না, বরং বাস্তবে এর প্রয়োগ দেখাতে হবে। দুর্নীতি দমনে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে না পারলে এটি কেবল একটি ‘প্রতিশোধ নেওয়ার দপ্তরে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ছাড়া শুধু আইন দিয়ে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর একজন প্রতিনিধির মতে, “দুদককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হলে এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”
উপসংহার
রাজনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে দুদকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে সংস্থাটি যদি নিজের ‘ইমেজ ক্রাইসিস’ কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে দুর্নীতির মহোৎসব থামানো কঠিন হবে। জনগণের বিশ্বাস ফেরাতে দুদককে দল-মত নির্বিশেষে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করতে হবে। অন্যথায়, ‘দুর্নীতি দমন’ শব্দটি কেবল রাজনৈতিক ভাষণের অলংকার হয়েই থেকে যাবে।

