এক সময় রাজনীতির মাঠ গরম হতো চায়ের কাপে ঝড় তুলে কিংবা রাজপথের মিছিলে। কিন্তু আধুনিক যুগে রাজনীতির নতুন ময়দান এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিন। ফেসবুক, এক্স (টুইটার) কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন রাজনৈতিক প্রচারণার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই ডিজিটাল বিপ্লব কি আসলেই শুদ্ধ রাজনীতি উপহার দিচ্ছে, নাকি ‘ফেক নিউজ’ বা গুজব ছড়িয়ে জনমতকে ভুল পথে চালিত করছে?
তথ্যের অবাধ প্রবাহ বা গুজবের মহামারি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর গতি। প্রথাগত গণমাধ্যমের আগেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে। সাধারণ মানুষ সরাসরি রাজনীতিবিদদের প্রশ্ন করতে পারছে, যা আগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। কিন্তু এই গতির সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ‘ডিপফেইক’ ভিডিও এবং এডিট করা ছবি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনেক সময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ পাঠক অনেক সময় সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ পান না, ফলে একটি ভুয়া খবর মুহূর্তেই দাঙ্গায় বা বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারে।
যেভাবে কাজ করে ‘অ্যালগরিদম’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মূলত ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী তথ্য দেখায়। আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো দলের অনুসারী হন, তবে আপনার নিউজফিড সেই দলের গুণগান আর বিপক্ষ দলের কুৎসা দিয়েই ভরে থাকবে। একে বলা হয় ‘ইকো চেম্বার’ (Echo Chamber)। এর ফলে মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা কমছে এবং সমাজ চরমভাবে মেরুকরণের দিকে ঝুঁকছে। নিজের পছন্দের বাইরের কোনো সত্যকেও মানুষ তখন গ্রহণ করতে চায় না।
ফ্যাক্ট না ফেক: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে দুটি প্রধান দিক পরিলক্ষিত হয়:
ফ্যাক্ট (সত্যতা): প্রান্তিক মানুষের দাবি সরাসরি নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছানো, দুর্নীতির খবর দ্রুত ফাঁস করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
ফেক (মিথ্যাচার): পেইড ট্রল আর্মি বা বোট (Bot) ব্যবহার করে কৃত্রিম জনমত তৈরি করা, চারিত্রিক হরণ এবং সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো।
সমাধানের পথ কী?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র আইন দিয়ে গুজব ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যবহারকারীর সচেতনতা। কোনো রাজনৈতিক খবর শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে সেই খবরের সত্যতা আছে কি না, তা দেখা জরুরি।
রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি ‘দুধারী তলোয়ার’। এটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে আবার তাসের ঘরের মতো ভেঙেও দিতে পারে। দিনশেষে এটি ‘ফ্যাক্ট’ হবে না ‘ফেক’ হবে, তা নির্ভর করছে আমাদের মাউসের ক্লিক আর চিন্তাশক্তির ওপর।

