ইউরোপের অন্যতম প্রবেশদ্বার স্পেনে বর্তমানে এক নজিরবিহীন অভিবাসী সংকট চলছে। উত্তর আফ্রিকার স্পেনীয় ছিটমহল সেউতা-তে লাখো অভিবাসীর আকস্মিক প্রবেশে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মক্ষম জনশক্তির সংকট কাটাতে এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কিছু নতুন আইন প্রণয়ন ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার।
সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার অভিবাসী সেউতা-তে প্রবেশ করেছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে “স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর সরাসরি আঘাত” বলে উল্লেখ করেছেন। জানা গেছে, বিপজ্জনক এই সীমান্ত পারাপারের সময় ভিড়ের চাপে এবং সমুদ্রে ডুবে অন্তত ৬৭ জন অভিবাসী মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেন সরকার সেউতা এবং মরক্কোর সমুদ্র সীমান্তে ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি নতুন প্রতিরোধক বেড়া স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। এ ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইতালি ও ডেনমার্কসহ ২২টি দেশ ইউরোপের বাহ্যিক সীমান্ত রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাদ্রিদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের সেউতা ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে একটি নিরাপত্তা সতর্কতাও জারি করেছে।
অভিবাসন আইনে বড় পরিবর্তনের জন্য সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করলেও স্পেনে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত অনথিভুক্ত বিদেশিদের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে দেশটির সরকার। প্রায় দুই দশক পর একটি ‘গণ-নিয়মিতকরণ’ বা সাধারণ ক্ষমা প্রক্রিয়া শুরু করেছে স্পেন। নতুন এই নিয়মের আওতায় যেসব অভিবাসী ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫-এর আগে স্পেনে প্রবেশ করেছেন এবং অন্তত ৫ মাস ধরে বসবাস করছেন, তারা বৈধতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এই প্রক্রিয়া আগামী ৩০ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
তবে, দেশের আবাসন সংকট ও ধনীদের অন্যায্য সুবিধা পাওয়া রোধ করতে বহুল আলোচিত ‘গোল্ডেন ভিসা’ কর্মসূচি বাতিল করেছে স্পেন। পাশাপাশি, নতুন ইইউ এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম কার্যকর হওয়ার ফলে এখন থেকে নন-ইইউ নাগরিকদের ৯০ দিনের নিয়মটি ডিজিটালভাবে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
মানবাধিকারের ক্ষেত্রে স্পেন ইউরোপে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। আইএলজিএ ইউরোপের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলজিবিটিকিউ+ অধিকার রক্ষায় টানা ১০ বছর ধরে শীর্ষে থাকা মাল্টাকে সরিয়ে স্পেন বর্তমানে ইউরোপের শীর্ষ স্থানে অবস্থান করছে।
এছাড়া, স্পেনের অর্থনীতি বর্তমানে কর্মী সংকটে ভুগছে। দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার শূন্যপদ রয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণে এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে স্পেন সরকার বৈধ ও দক্ষ অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর নীতি গ্রহণ করেছে।
সার্বিকভাবে, স্পেন একদিকে যেমন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে বৈধ পথে দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করেছে।

