Friday, May 8, 2026
35.1 C
Bangladesh

ভাইরাসজনিত রোগ ও বিশ্বস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও মানুষের জীবনের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে অতিক্ষুদ্র এক অণুজীব—ভাইরাস। এরা এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও এদের দেখা মেলে না। কিন্তু এই ক্ষুদ্র সত্তাটিই মানব সভ্যতার ইতিহাস বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইবোলা, সার্স এবং অতিমারি করোনার প্রকোপ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা কতটা অসহায় হতে পারি।

ভাইরাস মূলত কোনো স্বাধীন জীব নয়। এদের নিজস্ব কোনো প্রজনন ক্ষমতা নেই। বংশবৃদ্ধির জন্য এদের প্রয়োজন হয় একটি জীবন্ত পোষক কোষ। যখন একটি ভাইরাস কোনো প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে, তখন সে তার বংশগতির উপাদান—ডিএনএ (DNA) অথবা আরএনএ (RNA) পোষক কোষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় এক অদ্ভুত দখলদারিত্ব। ভাইরাসটি কোষের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেড়ে নিয়ে নিজের হাজার হাজার অনুলিপি তৈরি করতে থাকে।

একসময় পোষক কোষটি ভাইরাসের চাপে ফেটে যায় এবং নতুন তৈরি হওয়া ভাইরাসগুলো অন্য সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে। এই ধ্বংসলীলার ফলেই মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ে। মজার ব্যাপার হলো, ভাইরাস কোষে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট ‘রিসিভটর’ বা গ্রাহক প্রোটিন ব্যবহার করে। যেমন, এইচআইভি (HIV) ভাইরাস মানুষের শ্বেত রক্তকণিকার CD4 নামক প্রোটিনকে চাবি হিসেবে ব্যবহার করে ভেতরে প্রবেশ করে। এর ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই ধ্বংস হয়ে যায়।

ভাইরাসকে তাদের জেনেটিক গঠন এবং আকারের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পরিবারে ভাগ করা হয়। প্রতিটি পরিবারের ভাইরাসের আক্রমণের ধরন ভিন্ন।

★অ্যাডিনোভাইরাস: এরা সাধারণত সাধারণ সর্দি-কাশি, লিভার বা চোখের সংক্রমণের জন্য দায়ী। এদের গঠন ২০টি ত্রিভুজাকার তলের সমন্বয়ে তৈরি (Icosahedron)।

★হারপিস ভাইরাস: এই ভাইরাসগুলো অত্যন্ত ধূর্ত। এরা শরীরে প্রবেশের পর বছরের পর বছর সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। চিকেন পক্স বা জলবসন্ত এবং ওরাল আলসার এদের কারণেই হয়।

★পক্সভাইরাস: পক্সভাইরাস পরিবারের সবচেয়ে মারাত্মক সদস্য ছিল স্মলপক্স বা গুটিবসন্ত। তবে আশার কথা হলো, টিকার মাধ্যমে বিশ্ব থেকে এটি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।

★করোনাভাইরাস: এই পরিবারটি আমাদের কাছে এখন অতি পরিচিত। এটি সাধারণ সর্দি থেকে শুরু করে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট বা ‘সার্স’ (SARS) তৈরি করতে পারে।

★রেট্রোভাইরাস: এইচআইভি এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এরা আরএনএ থেকে ডিএনএ তৈরি করার জন্য ‘রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ’ নামক বিশেষ এনজাইম ব্যবহার করে।

যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যর্থ
ভাইরাসজনিত রোগের চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা প্রচলিত আছে—তা হলো অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। মনে রাখা জরুরি, অ্যান্টিবায়োটিক শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে কার্যকর, ভাইরাসের ওপর এর কোনো প্রভাব নেই। ভাইরাসজনিত রোগের প্রধান অস্ত্র হলো ভ্যাকসিন বা টিকা এবং অ্যান্টি-ভাইরাল ড্রাগ।

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সচেতনতাই সবচেয়ে বড় ঢাল। মাস্ক ব্যবহার করা, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা অনেক সংক্রামক ভাইরাস থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। বিশেষ করে মশাবাহিত ভাইরাস যেমন—ডেঙ্গু, জিকা বা ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস থেকে বাঁচতে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরা জরুরি।

বিশ্ব অর্থনীতি ও মানবিক বিপর্যয়
ভাইরাস কেবল শরীর খারাপ করে না, এটি একটি দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, প্রতি বছর কেবল হাম এবং গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসের কারণে ২০ লক্ষাধিক মানুষ মারা যায়। বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভাইরাসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।

আফ্রিকার দেশগুলোতে এইডস (AIDS) মহামারির ফলে ২০ থেকে ৬০ বছর বয়সী উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ হারিয়ে গেছে। এর ফলে গ্রামগুলোতে কেবল শিশু আর বৃদ্ধরা অবশিষ্ট থাকছে, যা অর্থনৈতিকভাবে দেশগুলোকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর টিকা বা ওষুধ থাকলেও দরিদ্র দেশগুলোর সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছায় না বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা আর অর্থাভাবে।

এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলা
বিগত কয়েক দশকে ‘এমার্জিং ডিজিজ’ বা উদীয়মান রোগ হিসেবে ইবোলা, মারবার্গ এবং এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (বার্ড ফ্লু) আবির্ভূত হয়েছে। ইবোলা এবং মারবার্গের মতো ফিলো-ভাইরাসগুলো এতটাই প্রাণঘাতী যে এদের নিয়ে গবেষণা করার জন্য সর্বোচ্চ স্তরের বায়ো-সেফটি ল্যাবরেটরি প্রয়োজন হয়। গবেষকদের ভয়, যদি বার্ড ফ্লু সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করে, তবে এটি বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ মহামারি সৃষ্টি করতে পারে।

ভাইরাস ও মানুষের এই লড়াই অনাদিকালের। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় আমরা অনেক ভাইরাসকে জয় করেছি, কিন্তু প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভাইরাস তাদের রূপ পরিবর্তন করে সামনে আসছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস না করা এবং বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার সমান বণ্টন নিশ্চিত করাই হতে পারে এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের আগামীর কৌশল।

তথ্যসূত্র:
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization – WHO) – সংক্রামক রোগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
২. সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেন্টশন (CDC) – ভাইরাল প্যাথোজেন ও ট্রান্সমিশন গাইডলাইন।
৩. ইউনিসেফ (UNICEF) – শিশুদের সংক্রামক রোগ ও টিকাদান কর্মসূচি।
৪. আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি – ভাইরাসের গঠন ও রেপ্লিকেশন সংক্রান্ত জার্নাল।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...