আজ থেকে শতবর্ষেরও বেশি সময় আগে, যখন ভারতবর্ষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং বিনোদন বলতে ছিল কেবল যাত্রা, থিয়েটার কিংবা সার্কাস—তখন এক অদম্য জেদি মানুষ ভারতের আকাশে নতুন এক সূর্যোদয় ঘটিয়েছিলেন। তিনি ধুন্দিরাজ গোবিন্দ ফালকে, যাঁকে আজ আমরা বিশ্বজুড়ে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ নামে চিনি। ১৯১৩ সালে তাঁর হাত ধরেই ভারত প্রথমবার রুপালি পর্দায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। তাঁর জীবন ছিল রূপকথার মতো উত্থান-পতন, সংগ্রাম এবং এক অবিশ্বাস্য জাদুর সংমিশ্রণ।
১৮৭০ সালের ৩০ এপ্রিল নাসিকের কাছে ত্র্যম্বকেশ্বরে এক তপোবন পরিবেশে জন্ম ফালকের। ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল। বোম্বের জে. জে. স্কুল অফ আর্টস থেকে অঙ্কন এবং বরোদার কলাভবন থেকে শিল্পের উচ্চতর পাঠ নিয়ে তিনি নিজের সৃজনশীল সত্তাকে শাণিত করেন। জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন একাধারে প্রতিকৃতি আলোকচিত্রী, মঞ্চের দৃশ্যপট শিল্পী, এমনকি প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের ড্রাফ্টসম্যানও। ১৯০৫ সালে তিনি নিজেই ‘ফালকে এনগ্রেভিং অ্যান্ড প্রিন্টিং ওয়ার্কস’ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিধাতা হয়তো তাঁর জন্য অন্য কোনো চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন।
যিশু থেকে হরিচন্দ্র ১৯১০ সালের একটি সন্ধ্যা ফালকের জীবন তথা ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস বদলে দেয়। বোম্বের একটি সিনেমা হলে তিনি ‘লাইফ অফ ক্রিস্ট’ (Life of Christ) চলচ্চিত্রটি দেখেন। যিশুর জীবন কাহিনী পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখে ফালকে শিহরিত হন। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—পর্দায় যদি বিদেশি দেবদূতদের দেখা যেতে পারে, তবে কেন ভারতীয় দেব-দেবীরা সেখানে স্থান পাবেন না?
এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ লড়াই। ১৯১১ সালে তিনি একটি মটরের চারার বৃদ্ধি নিয়ে ‘গ্রোথ অফ আ প্রি প্ল্যান্ট’ নামে একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের নেশা এবং নিরন্তর গবেষণার ফলে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন, এমনকি সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তিও হারান। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তিনি ছিলেন না। ১৯১২ সালে সমস্ত সঞ্চয় সম্বল করে তিনি লন্ডনে যান আধুনিক সরঞ্জাম কিনতে। সেখানে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সেসিল হেপওয়ার্থের সাথে তাঁর পরিচয় হয়, যা তাঁকে আধুনিক কারিগরি জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে।
লন্ডন থেকে ফিরে ১৯১৩ সালের এপ্রিল মাসে তিনি নির্মাণ করেন ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাকহীন চলচ্চিত্র ‘রাজা হরিশচন্দ্র’। এটি কেবল একটি সিনেমা ছিল না, এটি ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবোধের এক নীরব বহিঃপ্রকাশ। রাজা রবি বর্মার পৌরাণিক চিত্রকর্মের যে নান্দনিকতা মানুষের হৃদয়ে ছিল, ফালকে তাকেই গতিশীল রূপ দিলেন পর্দায়।
সেই সময় সিনেমা শিল্পকে সমাজ খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। এমনকি যৌনকর্মীরাও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে পুরুষদের দিয়েই নারী চরিত্রের অভিনয় করাতে হতো। তবে ফালকের জেদ এবং নিষ্ঠার কারণে পরবর্তীকালে দুর্গাবাঈ গোখলে এবং তাঁর কন্যা কমলাবাঈ চলচ্চিত্রে প্রথম নারী অভিনেত্রী হিসেবে নাম লেখান। এটি ছিল তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের বুকে এক বিশাল পরিবর্তন।
ফালকে কেবল একজন পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ জাদুকর। তাঁর চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘ডাবল এক্সপোজার’ বা ‘ডিসলভ’-এর মতো কারিগরি কৌশলগুলো সে সময় দর্শকদের রীতিমতো বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিত। ‘কালিয়া মর্দন’ (১৯১৮) চলচ্চিত্রে তাঁর কন্যা মন্দাকিনী যখন শিশু কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করেন, তখন পর্দার সেই অলৌকিক দৃশ্যগুলো দেখে সাধারণ মানুষ ভক্তিভরে প্রণাম জানাত। ফালকে প্রমাণ করেছিলেন যে, সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, এটি আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পের এক মেলবন্ধন।
১৯১৭ সালে ‘ফালকে ফিল্মস’ রূপান্তরিত হয় ‘হিন্দুস্তান ফিল্ম কোম্পানি’-তে। ১৯১৩ থেকে ১৯১৭—এই সময়কালটি ছিল ভীষণ কঠিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে সরঞ্জাম আমদানি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তবুও ফালকে থেমে থাকেননি। তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রায় ১০০টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ২২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে ১৯১৯ সালে তিনি সাময়িকভাবে বারাণসীতে অবসর গ্রহণ করেন। যদিও ১৯২২ সালে আবার পরিচালনায় ফিরে আসেন, কিন্তু ততদিনে সিনেমার জগৎ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে।
১৯৩২ সালে তাঁর পুরনো কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ফালকে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে তিনি তাঁর জীবনের শেষ এবং একমাত্র সবাক চলচ্চিত্র ‘গঙ্গাবতরণ’ নির্মাণ করেন। কিন্তু সবাক চলচ্চিত্রের নতুন যুগের সাথে পাল্লা দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই মহান শিল্পী প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। ১৯৪৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নাসিকে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন হয়তো ভারতীয় সিনেমা কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার নির্মাতা রয়ে গিয়েছিলেন অন্তরালেই।
আজকের ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প, যা প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন দাদাসাহেব ফালকে। তিনি কেবল ছবি বানাননি, তিনি একটি দেশের পরিচয় আর সংস্কৃতির আধুনিক দর্পণ তৈরি করেছিলেন। তাঁর প্রতি সম্মান জানাতেই ভারত সরকার চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ প্রবর্তন করেছে।
ফালকের জীবন আমাদের শেখায় যে, দৃষ্টিশক্তি হারানো মানেই সব শেষ নয়; যদি মনের জানলা খোলা থাকে, তবে অন্ধকার চিরে রুপালি আলো ঠিকই বেরিয়ে আসবে। আজ যখন আমরা অত্যাধুনিক ভিএফএক্স-এর যুগে বাস করছি, তখন দাদাসাহেব ফালকের সেই ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট পর্দার জাদুর কথা মনে পড়লে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।
তথ্যসূত্র:
১. বার্নো, এরিক এবং এস. কৃষ্ণস্বামী (১৯৬৫): ইন্ডিয়ান ফিল্ম, নিউ ইয়র্ক।
২. রামচন্দ্রন, টি.এম. (১৯৮৫): ৭০ ইয়ার্স অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা (১৯১৩–১৯৮৩), বোম্বে।
৩. রবি বাসুদেবন: দাদাসাহেব ফালকে বিষয়ক জীবনীমূলক নিবন্ধ।
৪. চাব্রিয়া, এস. (১৯৯৩): ডি.জি. ফালকে অ্যান্ড দ্য মেলিয়েস ট্র্যাডিশন ইন আর্লি ইন্ডিয়ান সিনেমা, কিন্টোপ।
৫. শুস্মিথ, বি. (১৯৮৯): স্বদেশী: সিনেমা, পলিটিক্স অ্যান্ড কালচার: দ্য রাইটিংস অফ ডি.জি. ফালকে, কন্টিনুয়াম।
৬. সিনেমাবিষয়ক জার্নাল: ক্লোজ আপ (জুলাই ১৯৬৮) এবং সিনেমা ভিশন (জানুয়ারি ১৯৮০)।

