পৃথিবীর চারভাগের তিনভাগ জলরাশি হলেও, সেই বিশাল জলভাণ্ডারের নিচে আজ এক নীরব হাহাকার চলছে। একসময় মনে করা হতো সমুদ্রের সম্পদ অফুরন্ত, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আর মানুষের সীমাহীন লোভ সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। বর্তমান বিশ্বে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন তার প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে মাছের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যেভাবে সমুদ্র থেকে মাছ উজাড় হচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের পুষ্টিসংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্তও মানুষ পালতোলা নৌকায় মাছ ধরত, যা প্রকৃতির ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলত না। কিন্তু ১৮৫০ সালের পর থেকে স্টিল ও লোহার তৈরি বিশালাকার জাহাজ এবং ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার মাছ ধরার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। আধুনিক ট্রলারগুলো এখন মাসের পর মাস মাঝ সমুদ্রে অবস্থান করতে পারে। বিশাল সব হিমঘর বা রেফ্রিজারেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে টন কে টন মাছ তাজা রাখা হচ্ছে, যা পৌঁছে যাচ্ছে সমুদ্র থেকে হাজার মাইল দূরের জনপদেও।
এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই মাছের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশকে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে কড, হ্যাডক এবং ফ্লাউন্ডার মাছের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। কানাডার উপকূলে কড ধরা নিষিদ্ধ করা হলেও ২০০৪ সাল পর্যন্ত সেই প্রজাতির সংখ্যা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। সোজা কথায়, মাছ যে হারে বংশবিস্তার করছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে মানুষ তা ধরে ফেলছে। ফলে অনেক প্রজাতি আজ বিলুপ্তির পথে।
সমুদ্রের মাত্র ০.২ শতাংশ এলাকা দখল করে আছে প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ, অথচ ২৫ শতাংশ সামুদ্রিক প্রজাতির আশ্রয়স্থল এই রঙিন জগৎ। কিন্তু অতি-আহরণের প্রভাব এখানেও পড়েছে। অনেক দেশে ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মাছ ধরা হয়, যা চোখের পলকে কয়েক মিলিয়ন বছরে গড়ে ওঠা প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস করে দেয়। প্রবাল ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো হাজার হাজার মাছের প্রজাতি তাদের আবাসস্থল ও প্রজনন কেন্দ্র হারানো।
কেবল অতি-আহরণ নয়, সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান ধ্বংসের পেছনে বড় কারণ হলো দূষণ। শিল্পোন্নত দেশগুলো সমুদ্র দূষণ রোধে আইন করলেও তা যথেষ্ট নয়। সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত বর্জ্য ও প্লাস্টিক সরাসরি মাছ না মারলেও তাদের খাদ্য উৎস ধ্বংস করছে। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে মাছেরা তাদের চেনা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, যা পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
বিপর্যয় রোধে ১৯৯০-এর দশকে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করে। এর মধ্যে দুটি পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়:
১. নো-টেক জোন (No-take zones):এটি এমন একটি সংরক্ষিত এলাকা যেখানে কোনো ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদিও বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশের কম এলাকা এই সুরক্ষার আওতায় আছে, তবে এর সুফল হাতেনাতে পাওয়া গেছে। যেমন, ১৯৯৭ সালে ফ্লোরিডা কি-জোনকে ‘নো-টেক জোন’ ঘোষণা করার মাত্র এক বছরের মাথায় সেখানে স্পাইনি লবস্টার ও স্ন্যাপার মাছের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
২. মাছ ধরার সীমা (Fishing Limits): এখানে নির্দিষ্ট মৌসুমে এবং নির্দিষ্ট ওজনের মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়। বিশেষ করে মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয় যাতে তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ২০০১ সালে কার্যকর হওয়া ‘Agreement on Straddling Fish Stocks and Highly Migratory Fish Stocks’ চুক্তির মাধ্যমে এক দেশের মাছ অন্য দেশের জলসীমায় গেলেও যাতে নির্বিচারে শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এছাড়া ১৯৮২ সালের ‘MARPOL 73/78’ চুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রে ময়লা, পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য এবং পুরনো জালের মতো ক্ষতিকারক বস্তু ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ পরিত্যক্ত জাল সমুদ্রে ‘ঘোস্ট ফিশিং’ করে, যা বছরের পর বছর মাছ ও প্রবালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সমুদ্রের তুলনায় মিঠা পানির মাছের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কম। এর কারণ হিসেবে গবেষক জোসেফ পি. হাইডার মনে করেন, মিঠা পানির মাছ সাধারণত সমুদ্রের মতো বিশাল ঝাঁক বেঁধে চলে না এবং বড় জাহাজ নদীতে চলাচল করা কঠিন। তবে নদী ও হ্রদ দূষণ এবং আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া মিঠা পানির মাছের জন্য প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি ২০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবিকার প্রশ্ন। আইন বা নীতিমালা কেবল কাগজে কলমে থাকলেই হবে না, বরং এর সঠিক প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা যদি আজ সমুদ্রের প্রতি যত্নশীল না হই, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো মাছকে কেবল বইয়ের পাতায় বা জাদুঘরেই দেখতে পাবে।
তথ্যসূত্রঃ
১.Jason Education Project (Texas A&M University):”Coral Reef Destruction and Conservation.”
২.The Ocean Conservancy: “Overfishing Issues and Impact.”
৩.United Nations (UN): “Overfishing: A Threat to Marine Diversity.”
৪.International Maritime Organization (IMO): “MARPOL 73/78 Agreement Details.”
৫.Joseph P. Hyder:Commercial Regulation of Fresh and Salt Water Fishing.

