Wednesday, July 29, 2026
32.2 C
Bangladesh

এক জাদুর পাতা ও বিশ্বজয়ের গল্প!

মানবসভ্যতার ইতিহাসে খুব কম উদ্ভিদই তামাকের মতো এত বিতর্ক, সম্পদ এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হতে পেরেছে। কখনো একে দেখা হয়েছে ‘সর্বরোগের ঔষধ’ হিসেবে, কখনো বা ‘নরকের কালো ধোঁয়া’ বলে তিরস্কার করা হয়েছে। কিন্তু সত্য এটাই যে, আমেরিকার আদিবাসীদের পবিত্র আচার থেকে শুরু করে আধুনিক বিশ্বের বিলিয়ন ডলারের বাজার পর্যন্ত তামাকের যাত্রা এক রোমাঞ্চকর মহাকাব্য।

তামাক বা Nicotiana tabacum-এর জন্ম মূলত আমেরিকায়। ইউরোপীয়রা এই মহাদেশে পা রাখার হাজার বছর আগে থেকেই স্থানীয় আদিবাসীরা তামাক চাষ করত। তাদের কাছে এটি কেবল নেশার বস্তু ছিল না, ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। কোনো গোত্রে নতুন শিশুর বাপ্তিস্ম হোক বা কোনো শান্তি চুক্তি—অগ্নিশিখায় তামাকের ধোঁয়া ছিল অপরিহার্য।

১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন প্রথমবার ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পা রাখেন, তার নাবিকরা অবাক হয়ে দেখেছিলেন স্থানীয়রা এক বিশেষ ধরনের শুকনো লতা পুড়িয়ে তার ধোঁয়া টেনে নিচ্ছেন। ১৫৩০-এর দশকে ফরাসি অভিযাত্রী জাক কার্তিয়ে যখন কানাডার সেন্ট লরেন্স নদীর তীরে পৌঁছান, সেখানেও তিনি ইরোকুইস আদিবাসীদের পাইপ হাতে বিশ্রাম নিতে দেখেন। মেক্সিকোর প্রাচীন সমাধিগুলোতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের পাওয়া অলঙ্কৃত পাইপ প্রমাণ করে যে, এই মহাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল তামাকের ঘ্রাণ।

ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে তামাকের স্বাদ পৌঁছাতে শুরু করে। ১৫৫৯ সালে পর্তুগালে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জঁ নিকোট (Jean Nicot)—যার নামানুসারে উদ্ভিদটির নাম রাখা হয় ‘নিকোটিন’—ফ্লোরিডা থেকে আসা কিছু তামাক বীজ লিসবনে নিয়ে আসেন। মুহূর্তেই এটি অভিজাত সমাজে জনপ্রিয়তা পায়। সে সময় চিকিৎসক নিকোলাস মনার্ডেস দাবি করেছিলেন, তামাক ধূমপান করা সব রোগের সমাধান বা ‘প্যানাসিয়া’।

তবে সবাই এর পক্ষে ছিলেন না। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমস ১৬০৪ সালে তামাকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি তার বিখ্যাত বই ‘এ কাউন্টারব্লাস্ট টু টোব্যাকো’-তে ধূমপানকে ‘মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর ও ফুসফুসের জন্য বিপজ্জনক’ বলে বর্ণনা করেন। মজার বিষয় হলো, তামাক অপছন্দ করলেও এর রাজস্বের লোভ তিনি সামলাতে পারেননি। ১৬০৪ সালের অক্টোবরে তিনি তামাকের ওপর বিশাল কর আরোপ করেন, যা আধুনিক তামাক কর ব্যবস্থারই এক আদিম রূপ।

তামাক চাষের ইতিহাস মানেই বিশাল সব আবাদ বা প্ল্যান্টেশনের ইতিহাস। স্প্যানিশরা প্রথম বাণিজ্যিকভাবে হিস্পানিওলা দ্বীপে তামাক চাষ শুরু করে। পরবর্তীতে তা ত্রিনিদাদ ও ভেনিজুয়েলায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তামাকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ভার্জিনিয়া কলোনিতে। ১৬১২ সালে জন রলফ আদিবাসী পদ্ধতিতে তামাক চাষ ও কিউরিং বা শুকানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। এটি এতই লাভজনক ছিল যে, ভার্জিনিয়া তথা আমেরিকার ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর টিকে থাকার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় এই ‘সোনালী পাতা’।

তবে এই বিশাল আবাদের জন্য প্রয়োজন ছিল অঢেল শ্রমিকের। তামাকের কারণেই শুরু হয় কুখ্যাত ‘ত্রিভুজাকার বাণিজ্য’ (Triangular Trade)। আফ্রিকা থেকে লাখ লাখ মানুষকে জোরপূর্বক জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয় তামাক, চিনি ও তুলা ক্ষেতে কাজ করার জন্য। তামাকের ধোঁয়ায় যে আভিজাত্য ফুটে উঠত, তার পেছনে মিশে ছিল কোটি মানুষের রক্ত ও ঘাম।

বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্রোহ
অষ্টাদশ শতাব্দীতে তামাক ছিল রাষ্ট্রের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ রাজারা তামাক বিক্রির ওপর ‘এস্তানকো’ বা রাজকীয় একচেটিয়া অধিকার কায়েম করেন। কিন্তু রাষ্ট্রের এই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ সবসময় সুখকর ছিল না। কর ফাঁকি দেওয়া ও অবৈধ বাণিজ্য রুখতে গিয়ে সরকারের সাথে কৃষকদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

১৭৮১ সালে নিউ গ্রানাডায় (বর্তমান কলম্বিয়া) ‘কমুনেরো বিদ্রোহ’ ছিল তামাক চাষের ওপর বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে এক বড় গণঅভ্যুত্থান। ক্ষুদ্র কৃষকরা সরকারের কঠোর নিয়মের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। অন্যদিকে কিউবার তামাক তার গুণের কারণে বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে। আঠারোশ শতকের শুরুতে হাতে বানানো ‘হাভানা চুরুট’ বা সিগার লন্ডনের বাজারে আভিজাত্যের শেষ কথা বলে গণ্য হতো।

তামাক চাষের একটি অন্ধকার দিক ছিল মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া। তামাক গাছ মাটি থেকে প্রচুর পুষ্টি শুষে নেয়, ফলে কয়েক বছর চাষের পরই জমি অনাবাদী হয়ে পড়ত। এই কারণেই ভার্জিনিয়ার চাষিরা একের পর এক নতুন জমির খোঁজে পশ্চিমে অগ্রসর হতে থাকে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জগুলো ছোট হওয়ায় সেখানে তামাকের চেয়ে আখ চাষ বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ তামাকের জন্য প্রয়োজনীয় ‘সীমাহীন জমি’ সেখানে ছিল না।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর তামাক বাণিজ্য আরও বিস্তৃত হয়। জার্মানি থেকে শুরু করে এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে তামাকের চালান পৌঁছাতে থাকে। বিংশ শতাব্দীতে এসে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এই বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এক সময় যে তামাককে ভেষজ ঔষধ ভাবা হতো, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তার ক্ষতিকর দিকগুলো সবার সামনে এনেছে। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় সচেতনতা বাড়ার ফলে তামাকের ব্যবহার কমলেও এশিয়া ও আফ্রিকায় এর বাজার এখনও বিশাল।

পাঁচশ বছরের এই যাত্রায় তামাক কেবল একটি পণ্য থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্য উত্থান-পতনের সাক্ষী। তামাকের ধোঁয়ায় যেমন একসময় রাজকোষ ভরে উঠত, তেমনি এর উৎপাদন প্রক্রিয়া বদলে দিয়েছে পৃথিবীর মানচিত্র ও জনমিতি। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, মানুষের নেশা আর রাষ্ট্রের মুনাফা যখন এক সুতোয় গাঁথা হয়, তখন তামাকের মতো সাধারণ এক উদ্ভিদও হয়ে উঠতে পারে বিশ্ব ইতিহাসের নিয়ন্ত্রক।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...