সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল যে মাটিকে কেন্দ্র করে, সেই মাটিই আজ সংকটের মুখে। হাজার বছর ধরে মানুষ মাটিকে কর্ষণ করেছে, ওলটপালট করেছে সোনার ফসল ফলানোর আশায়। কিন্তু আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত কর্ষণ বা ‘টিলেজ’ (Tillage) মাটির আশীর্বাদ হওয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদিকাল থেকে বর্তমান—চাষাবাদের এই বিবর্তন কেবল কৌশলের পরিবর্তন নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার এক মহাকাব্য।
দশ থেকে বারো হাজার বছর আগে নিকট প্রাচ্যে যখন কৃষির সূচনা হয়, তখন মানুষের হাতে ছিল কেবল একটি খনন লাঠি (Digging stick)। সেই কাষ্ঠখন্ড দিয়ে মাটি আলগা করার মধ্য দিয়েই সূচিত হয়েছিল আজকের আধুনিক কৃষি। সময়ের সাথে সেই লাঠি রূপান্তরিত হয়েছে কোদাল ও ত্রিভুজাকার ফলায়। ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ায় যখন মানুষ প্রথমবারের মতো পশু দিয়ে লাঙল টানাতে শিখল, তখন থেকেই কৃষিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে।
আঠারো শতকের ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেথ্রো টাল প্রথম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন যে, মাটি আলগা করলে শিকড় সহজেই পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। এরপর একে একে চার্লস নিউবোল্ডের ঢালাই লোহার লাঙল এবং ১৮৩৭ সালে জন ডিয়ারের স্টিল লাঙল কৃষিকে নিয়ে যায় বাণিজ্যিক উচ্চতায়। জর্জ মার্শ ১৮৪৭ সালে ভার্মন্টের এক সভায় বলেছিলেন, “মানুষ যখন যাযাবর জীবন ছেড়ে নিয়মিত ভূমি কর্ষণ শুরু করে, তখনই তার সামাজিক ও পারিবারিক অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটে।” মূলত ভূমির মালিকানা এবং স্থায়ী বসতির ধারণা জন্মেছিল এই লাঙল চালনার মাধ্যমেই।
একটি ঐতিহাসিক সতর্কতা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঘোড়া ও খচ্চরের জায়গা নিল শক্তিশালী ট্রাক্টর। ১৯৫০-এর দশকে ট্রাক্টরের সংখ্যা পশু শক্তিকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এই যান্ত্রিকীকরণ যে সবসময় আশীর্বাদ ছিল না, তার প্রমাণ ১৯৩০-এর দশকের ভয়াবহ ‘ডাস্ট বোল’ (Dust Bowl)।
আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের বিশাল তৃণভূমি যখন যান্ত্রিক লাঙলের নিচে চলে এল, তখন সেখানকার প্রাকৃতিক ঘাসগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। খরা আর তীব্র বাতাসের কবলে পড়ে উন্মুক্ত মাটি ধূলিকণায় পরিণত হয়ে আকাশে উড়তে শুরু করে। আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত আকাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল সেই ধুলোয়। লাখ লাখ একর জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়। কৃষিবিজ্ঞানী হিউ বেনেট তখন সতর্ক করেছিলেন যে, মাটি ক্ষয় বা ‘সুইল ইরোশন’ আসলে সভ্যতার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত।
কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং ১৯৫০-এর দশকের পর আগাছানাশক ওষুধের আধিপত্য কৃষিকাজকে আরও সহজ করে দেয়। আশির দশকে ‘সংরক্ষণশীল চাষাবাদ’ বা Conservation Tillage জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল মাটি না খুঁড়ে বা কম খুঁড়ে চাষ করা, যাতে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং ক্ষয় রোধ হয়।
তবে শুরুর দিকে এই পদ্ধতিটি ছিল বিতর্কিত। কারণ, মাটি না খুঁড়লে আগাছা দমনের জন্য প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত হার্বিসাইড বা আগাছানাশক ব্যবহার করতে হতো, যা পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ ছিল।
টেকসই কৃষি: আগামীর সমাধান
১৯৮৯ সালের দিকে একদল দূরদর্শী কৃষক ও বিজ্ঞানী উপলব্ধি করেন যে, কেবল উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, মাটিকেও বাঁচাতে হবে। জন্ম নিল ‘টেকসই কৃষি’ (Sustainable Agriculture) আন্দোলন। এই পদ্ধতির মূল মন্ত্র হলো:
খরচ কমানো: অপ্রয়োজনীয় যান্ত্রিক কর্ষণ এড়িয়ে যাওয়া।
প্রাকৃতিক চক্র: রাসায়নিকের বদলে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকামাকড় দমন এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি।
সম্পদ রক্ষা: মাটির ক্ষয় রোধ করে ভূগর্ভস্থ পানি ও পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা।
বর্তমানে সারা বিশ্বের কৃষকরা বুঝতে পারছেন যে, মাটি কেবল ধূলিকণা নয়, এটি একটি জীবন্ত সম্পদ। আজকের টিলেজ বা কর্ষণ পদ্ধতি আর আগের মতো অন্ধভাবে মাটি খুঁড়ে ফেলার নাম নয়; বরং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে ফসল ফলানোর এক সচেতন প্রয়াস।
কৃষিবিদদের মতে, আমরা যদি আজও মাটির সুরক্ষায় যত্নবান না হই, তবে ডাস্ট বোলের মতো দুর্যোগ যেকোনো সময় ফিরে আসতে পারে। মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকলেই কেবল মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

