ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি কেন জিতল, তা বোঝার জন্য গভীরভাবে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। কারণ, সমাজের প্রত্যেকটি জায়গায় হাইপ ছিল, জামায়াত এবার ক্ষমতায় আসতে পারে। এটা সম্পষ্ট যে, জামায়াতের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিল যা শেষতক ভোটের ফলাফলে রূপান্তরিত করতে পারেনি। ফলাফল ঘোষণার পর, দেখা গেল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়েছে, আর জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে মোট ৭৭টি আসন। ১৯৯১ সালে যেখানে তাদের সর্বোচ্চ অর্জন ছিল মাত্র ১৮টি আসন, সেখানে এই ফলাফল মোটেও সামান্য নয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক নির্বাচনের আগেই বলেছিলেন যে জামায়াতের জনসমর্থন বেড়েছে, এবং ভোটের ফলাফল সেই দাবিকে অনেকাংশে সত্য প্রমাণ করেছে। কিন্তু বিদ্যমান পদ্ধতিতে ভোটের হার বাড়লেই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫১টি আসন জেতা যায় না।
এই নির্বাচন কোনো যুগান্তকারী বিপ্লবের ফসল ছিল না, যদিও ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনকে উৎখাত করা গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পরেই এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো গভীর মতাদর্শিক ভাঙন ঘটেনি, ভোটারদের আনুগত্যে কোনো স্থায়ী বা আমূল পরিবর্তন আসেনি—অন্তত এমন কোনো মাত্রায় নয়, যা দেশের নির্বাচনী মানসিকতার কাঠামোকে বদলে দিতে পারে।
এবং অবশ্যই, এটি কোনো ‘জাতীয় জোয়ার’ বা ‘ওয়েভ ইলেকশন’ ছিল না—যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা অঞ্চল নির্বিশেষে সবাই একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যা ঘটেছে তা ছিল একটি সমন্বিত চিত্র: মূলত একটি স্বাভাবিক নির্বাচন, কিছু উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতিসহ, তবে ফলাফল ছিল অনেকটাই অনুমেয়।
দলীয় অন্ধ অনুগতরা বেশিরভাগই ঘরে থেকে গেছেন। ‘সুইং ভোটার’ বা দোদুল্যমান ভোটাররা ছিলেন নির্ণায়ক। আর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি হতাশা থেকে সাময়িক দলত্যাগের ঘটনা ঘটেছে—যার অনেকটাই গেছে জামায়াত বা এনসিপির ঝুলিতে।
মানুষের ক্ষোভটা ছিল একেবারে বাস্তব। ৫ আগস্টের পর বিএনপির তৃণমূল সংগঠন শোচনীয়ভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জেলায় জেলায় পাতি নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ বাজার আর শহরের উপকণ্ঠে ক্ষোভ ধিকিধিকি জ্বলছিল।
ভোটাররা শুধু হতাশই ছিলেন না; চায়ের দোকান আর ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে যে ভাষা শোনা যাচ্ছিল, সেই ভাষায় বলতে গেলে—তারা “ভীষণ ক্ষ্যাপা” ছিলেন। এই ক্রোধই জামায়াতের উত্থানের কারণ। বিএনপির একাংশ অনুগত কর্মী এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুইং ভোটার একটি “সৎ বিকল্পের” প্রতিশ্রুতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু ঝোঁক মানেই নিয়তি নয়।
বিএনপির কুশলী মনোনয়নএবং গ্রামীণ বাস্তবতা
বিএনপির ভিত্তি—যা ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের চেয়ে ব্যাপকতর ও সাংগঠনিকভাবে গভীরতর—তা ধসে পড়েনি। দলত্যাগের পরেও সংখ্যাগত দিক থেকে এটি বড়ই ছিল। বিএনপির মনোনয়ন কৌশল অপ্রত্যাশিতভাবে বুদ্ধিদীপ্ত প্রমাণিত হয়েছে।
যেখানে জামায়াত তুলনামূলকভাবে অপরিচিত কিন্তু মতাদর্শিকভাবে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাঠে নামিয়েছে, সেখানে বিএনপি ভরসা রেখেছে তাদের ‘পুরোনো প্রহরীদের’ ওপর—এমন প্রার্থী যাদের নাম মানুষ চেনে এবং যাদের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের জাল সমাজে খুব গভীর।
গ্রামীণ বাংলাদেশে এটি ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শহুরে, শিক্ষিত ভোটাররা হয়তো নৈতিক সুশাসনের বক্তৃতায় আলোড়িত হন। তাদের কাছে একজন দুর্নীতিমুক্ত, মতাদর্শিকভাবে সুশৃঙ্খল প্রার্থীর ধারণা একটি নৈতিক পুনর্জাগরণ হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু গ্রামীণ ভোটাররা মূলত বাস্তববাদী। তারা জটিল এক পৃষ্ঠপোষকতার জালের মধ্যে বসবাস করেন। তাদের কাছে একজন সংসদ সদস্য কোনো বিমূর্ত ধারণা নন; তিনি (সাধারণত পুরুষই হন) হলেন সামাজিক নিরাপত্তা, চাকরি, স্থিতিশীলতা আর বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যম বা দালাল। কেবল সততা এই সুবিধাগুলোর নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু ‘পরিচিতি’ দেয়।
এভাবেই তৈরি হয়েছে ভোটারদের কেন্দ্রীয় দোটানা। বিএনপির বাড়াবাড়িতে বিরক্ত হয়ে অনেকেই দল বদলের কথা ভেবেছেন। যেসব আসনে জামায়াত একজন পরিচিত নেতাকে মাঠে নামিয়েছে, সেখানে কেউ কেউ সত্যিই ভোট দিয়েছেন। কিন্তু অন্য জায়গায়, ভোটাররা এমন প্রার্থীদের সামনে পড়েছেন যাদের তারা চেনেন না, যাদের ‘সততা’ তারা যাচাই করতে পারেন না, এবং যাদের দল কেবল নৈতিক বুলি ছাড়া আর বিশেষ কিছু দিতে পারেনি—অনিশ্চয়তার মুখে তারা সেই ‘চেনা শয়তান’কেই (devil they knew) বেছে নিয়েছেন।
জামায়াতের কৌশলগত ভুলএবং নারী ভোটার
জামায়াত তাদের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে কৌশলগত ভুলের মাধ্যমে। নারী ইস্যুতে তাদের অবস্থান ছিল বিব্রতকর—কখনও আশ্বাস আবার কখনও বা পরোক্ষ হুমকি—যা নারী ভোটারদের এক বিশাল অংশকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। অথচ নারীরা এখন বাংলাদেশের জনপরিসরে, শ্রমবাজারে এবং শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। যে দল লিঙ্গসমতার একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপকল্প তুলে ধরতে পারে না, তারা জাতীয় জোয়ার তৈরি করতে পারে না।
এছাড়া অনেকেই মনে করেন যে, ১৯৭১ সালে জামায়াতের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে নরম করার বা নতুন করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা : শুধু ধর্মনিরপেক্ষ-উদারপন্থী সমাজকেই নয়, এর বাইরের বিপুল সংখ্যক ভোটারকেও বিমুখ করেছে।
এমনকি রক্ষণশীল পরিবারগুলোও ১৯৭১ নিয়ে একটি লক্ষ্মণরেখা টেনে রেখেছে। জনমানসের প্রচলিত মনোভাব সম্ভবত এমন ছিল: ক্ষমা করা যায়, কিন্তু ভোলা যায় না।
তবুও জামায়াতের এই পারফরম্যান্স ছিল ঐতিহাসিক। জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্র জোট ৭৭টি আসন পেয়েছে—এটি শুধু তাদের সুশৃঙ্খল ক্যাডার বাহিনীর প্রমাণ নয়, বরং বিএনপির নিজের কুকর্মেরও ফল। চাঁদাবাজি আর স্থানীয় নেতাদের দাম্ভিকতা ভোটারদের ঠেলে দিয়েছে জামায়াতের কোলে।
এফপিটিপি বা সরল সংখ্যাগরিষ্ঠতার নির্বাচনী ব্যবস্থায়, মাত্র কয়েক শতাংশ ভোটের ব্যবধান অনেকগুলো আসনের ফলাফল উল্টে দিতে পারে। জামায়াত রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে—যেখানে তাদের সংগঠন শক্তিশালী—সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে নিখুঁতভাবে।
কিন্তু ‘নিখুঁততা’ আর ‘বিস্তৃতি’ এক জিনিস নয়। জামায়াতের উত্থান ছিল আঞ্চলিকভাবে সীমাবদ্ধ। তাদের সমর্থন শ্রেণি, লিঙ্গ, শিক্ষা ও বয়সভেদে ওঠানামা করেছে। এটি কোনো ‘ওয়েভ ইলেকশন’-এর লক্ষণ নয়। সারাদেশে সমান গতিবেগ ছাড়া এফপিটিপি পদ্ধতিতে বিজয়ী হওয়া সহজ নয়।
আওয়ামী লীগ ফ্যাক্টর এবং ভোটারদের মনস্তত্ত্ব
তারপর ছিল যন্ত্রের ভেতরের ভূত: আওয়ামী লীগ। অনেক বিশ্লেষকই তাদের অবশিষ্ট ভোটব্যাংককে অবমূল্যায়ন করেছেন। জরিপগুলো বলছিল, ৫ থেকে ৭ শতাংশ কট্টর সমর্থক কখনোই দল ছাড়বে না। কিন্তু এর বাইরে ছিল আরও বড় একটি অংশ—সম্ভবত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ—যারা হয় সিদ্ধান্তহীন ছিলেন অথবা নিজেদের পছন্দ প্রকাশ করতে চাননি। এই নির্বাচনে সেই অংশটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন-পূর্ব মাঠ গবেষণা ও জরিপ ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের অনেক সাধারণ ভোটার (যারা কট্টর নন) বিএনপির দিকে ঝুঁকছিলেন—আদর্শের টানে নয়, বরং ব্যবহারিক যুক্তিবোধ থেকে। তারা বিশ্বাস করতেন বিএনপিই সরকার গঠন করবে, তাই বিজয়ী সংসদ সদস্যের মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা পেতে তারা সেই দিকেই ঝুঁকেছেন।
যেসব এলাকায় বিএনপির পুরোনো নেতারা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হয়রানি করেছেন, সেখানে কেউ কেউ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন বা জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছেন। কিন্তু জাতীয়ভাবে, মহাকর্ষীয় টান ছিল বিএনপির দিকেই। ভোটাররা বিজয়ীর পক্ষেই থাকতে চেয়েছেন। এই ধারণা বা পারসেপশন শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচনের দিনের আগে চারটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি ঝুঁকির মাত্রা স্পষ্ট করে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতি ছাড়া, বিএনপি সম্ভবত একটি কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সামান্য ব্যবধানে জিতত। মাঝারি মাত্রার আওয়ামী লীগ সমর্থনে, তারা আরামদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত। আর যদি আওয়ামী লীগ ব্যাপকভাবে সমর্থন দিত, তবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অসম্ভব ছিল না। একমাত্র জামায়াতের পূর্ণাঙ্গ জোয়ার—শ্রেণি ও লিঙ্গ নির্বিশেষে জাতীয় এক জাগরণ—এই সমীকরণ উল্টে দিতে পারত। সেই জোয়ার কখনোই আসেনি।
সমাপ্তি এবং নতুন শক্তির উত্থান
সুতরাং, বিএনপির বিজয় হলো—কাঠামোগত সুবিধা, কৌশলগত প্রার্থী নির্বাচন এবং দেশের প্রথাগত ভোটারদের যুক্তিবাদী হিসাব-নিকাশের ফলাফল। নারী অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জামায়াতের আত্মঘাতী ভুল এতে সহায়তা করেছে। এবং বিচিত্রভাবে, বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের অসদাচরণ জামায়াতের ভোট বাড়ালেও, এফপিটিপি পদ্ধতির গণিতকে হারানোর মতো যথেষ্ট ছিল না।
এই নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পাদটীকা হলো ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) উত্থান, যারা পাঁচটি আসন পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই তীব্র মেরুকরণযুক্ত রাজনীতিতে, অভ্যুত্থানের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া একটি নতুন দলের জন্য এটি সামান্য অর্জন নয়।
এটি বিএনপি ও জামায়াতের নতুন দ্বিমেরু রাজনীতির বাইরে বিকল্পের জন্য মানুষের ক্ষুধার ইঙ্গিত দেয়—তা যতই সামান্য হোক। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় (PR system) হয়তো এমন দল আরও বিকশিত হতে পারত। কিন্তু এফপিটিপি ব্যবস্থায়, পাঁচটি আসন একই সঙ্গে একটি বড় সাফল্য এবং একটি সীমারেখা।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত ছিল সীমাবদ্ধতার গল্প: ক্রোধের সীমাবদ্ধতা, নৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতা, ইতিহাস বদলানোর চেষ্টার সীমাবদ্ধতা এবং ‘বিজয়ী-সব-পাবে’ ব্যবস্থায় সাংগঠনিক শক্তির অটুট ক্ষমতার গল্প। বিএনপি জিতেছে জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে নয়, বরং জাতিকে ‘বুঝেছে’ বলে।
সূত্র : বিবিসি

