Wednesday, July 29, 2026
32.2 C
Bangladesh

বিড়াল সম্পর্কে ইসলাম ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি

মানব সভ্যতার আদিকাল থেকেই বিড়াল মানুষের অন্যতম সঙ্গী হিসেবে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বে পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়ালের জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকার অন্যতম কারণ এর পরিচ্ছন্নতা এবং মানুষের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। বিড়াল পালন নিয়ে ইসলাম ধর্মের স্পষ্ট নির্দেশনা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের চমৎকার সব গবেষণা রয়েছে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা ইসলাম ও বিজ্ঞানের আলোকে বিড়াল পালনের আদ্যোপান্ত আলোচনা করব।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে পশুপাখির অধিকার ও তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিড়াল সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ইতিবাচক।

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিড়াল কুকুর বা অন্যান্য কিছু প্রাণীর মতো অপবিত্র নয়। বিড়ালের লালা বা বিড়াল ঘরে চলাফেরা করা নিয়ে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিড়াল সম্পর্কে বলেছেন:

“এরা অপবিত্র নয়, বরং এরা তোমাদের আশেপাশে অধিক বিচরণকারী।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং- ৯২)

এমনকি বিড়াল যদি পাত্র থেকে পানি পান করে, সেই পানি দিয়ে অজু করাও জায়েজ বলে অনেক ফকিহ মত দিয়েছেন।

ইসলামে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিপরীতে, বিড়ালের প্রতি দয়া প্রদর্শন ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে সাখরকে রাসুল (সা.) ভালোবেসে ‘আবু হুরায়রা’ বা ‘বিড়ালের পিতা’ উপাধি দিয়েছিলেন, কারণ তিনি সর্বদা একটি বিড়াল সাথে রাখতেন এবং তার সেবা করতেন।

বিড়ালকে কষ্ট দেওয়া বা আটকে রেখে না খাইয়ে মারার ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

“এক মহিলাকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেওয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল এবং পরিশেষে বিড়ালটি মারা গিয়েছিল। মহিলাটি বিড়ালটিকে খাবার দেয়নি এবং তাকে ছেড়েও দেয়নি যেন সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বাঁচতে পারে। এর ফলে মহিলাটি জাহান্নামী হলো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ৩৩১৮)

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞান বিড়াল পালনের একাধিক শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা প্রমাণ করেছে। বিড়ালের সংস্পর্শে থাকা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মিনিসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্ট্রোক ইনস্টিটিউট’-এর একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিড়াল পালেন তাদের হৃদরোগে বা হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বিড়াল না পোষা ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ৩০% থেকে ৪০% কম। বিড়ালের সাথে সময় কাটালে শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মানসিক চাপ কমে।

বিড়াল আদর করলে মানবদেহে অক্সিটোসিন (Oxytocin) হরমোন নিঃসৃত হয়, যাকে ‘লাভ হরমোন’ বলা হয়। এটি তাৎক্ষণিকভাবে স্ট্রেস এবং উদ্বেগ কমিয়ে দেয়। বিড়ালের গায়ের বিশেষ এক ধরণের গুঞ্জন বা ‘Purring’ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিড়ালের গুঞ্জনের কম্পন (Frequency) সাধারণত ২০ থেকে ১৪০ হার্টজ (Hz) এর মধ্যে থাকে। এই নির্দিষ্ট কম্পন মানুষের হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে, ক্ষত সারাতে এবং পেশীর ব্যথা উপশমে চিকিৎসাগতভাবে সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছে।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু জন্মের প্রথম বছর থেকে বিড়ালের সাথে বেড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে হাঁপানি (Asthma), অ্যালার্জি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কম থাকে। বিড়ালের সংস্পর্শ শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

বিড়াল পবিত্র প্রাণী, এর লালা নাপাক নয়।বিড়াল নিজের শরীর নিজেই পরিষ্কার রাখে এবং এদের লালায় কিছু অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ থাকে।
বিড়াল ইঁদুর বা ক্ষতিকারক প্রাণী থেকে ঘর রক্ষা করে।বিড়াল শিকারি প্রাণী হওয়ায় বাড়িতে পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব কমায়। মানসিক অবস্থা বিড়াল মানুষের একাকীত্ব দূর করে। বিড়ালের সঙ্গ একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা (Depression) দূর করতে সহায়ক।

ইসলাম ও বিজ্ঞান উভয়ই বিড়াল পালনের ক্ষেত্রে কিছু দায়বদ্ধতার কথা বলে:
বিড়ালকে পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ আশ্রয় দিতে হবে।
বিড়ালের লিটার বক্স নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি যাতে রোগজীবাণু না ছড়ায়।
বিড়ালের শরীর খারাপ হলে পশু চিকিৎসকের (Vet) পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দিতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, বিড়াল পালন কেবল শখের বিষয় নয়, বরং এটি ইসলামি মূল্যবোধের নিরিখে সওয়াবের কাজ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে সুস্বাস্থ্যের সহায়ক। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে সৃষ্টির সেবা করতে, আর বিজ্ঞান আমাদের দেখাচ্ছে সেই সেবার মাধ্যমে কীভাবে আমরা নিজেরাও উপকৃত হতে পারি। একটি বিড়ালের প্রতি দয়া প্রদর্শন আপনার পরকালীন মুক্তির পাশাপাশি ইহকালীন মানসিক প্রশান্তির চাবিকাঠি হতে পারে।

তথ্যসূত্র

(References): ১. সহিহ বুখারি ও সুনানে তিরমিজি (হাদিস গ্রন্থ)। ২. University of Minnesota Stroke Institute Study on Cat Ownership. ৩. Journal of Vascular and Interventional Neurology. ৪. The Therapeutic Effects of Cat Purring (Scientific American).

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...