প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময় হলো মানবদেহ। আর এই দেহের ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা যে ব্যবস্থাটি আমাদের প্রতিটি অনুভূতি, চলাচল এবং চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা হলো আমাদের স্নায়ুতন্ত্র। সাধারণ অর্থে আমরা একে ‘নার্ভ’ বা স্নায়ু বলে চিনি। ধ্রুপদী শরীরস্থান বা অ্যানাটমির ভাষায়, স্নায়ু হলো শ্বেতশুভ্র সুতোর মতো এক ধরনের তন্তু বা তার (Cable), যা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড থেকে শরীরের প্রতিটি প্রান্তে তথ্যের আদান-প্রদান নিশ্চিত করে।
আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে একটি বিশাল বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এর মূল কাণ্ড হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড), আর সেখান থেকে ডালপালার মতো ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য স্নায়ু। মজার বিষয় হলো, এই ডালপালাগুলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে যত দূরে যায়, ততই তা সরু হতে থাকে। কোনো কোনো স্নায়ুর ব্যাস ১ সেন্টিমিটারের বেশি হতে পারে, আবার প্রান্তীয় পর্যায়ে তা ১ মিলিমিটারের চেয়েও অনেক ছোট হয়ে যায়।
এই ব্যবস্থার গুরুত্ব আমরা তখনই হাড়ে হাড়ে টের পাই, যখন কোনো দুর্ঘটনায় একটি স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি স্নায়ু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট অঙ্গটির অনুভূতি হারিয়ে যায়, দেখা দেয় প্রচণ্ড ব্যথা কিংবা মাংসপেশি হয়ে পড়ে অবশ। আমাদের শরীরের অন্যতম পরিচিত স্নায়ু হলো ‘সায়াটিক নার্ভ’। যখন এটি প্রদাহের শিকার হয় বা চাপে পড়ে, তখন পায়ের পেছন দিকে যে তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হয়, তাকেই আমরা ‘সায়াটিকা’ বলি। এই সমস্ত স্নায়ু আমাদের প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের (Peripheral Nervous System) অন্তর্ভুক্ত।
একটি দৃশ্যমান স্নায়ুকে যদি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখা হয়, তবে দেখা যাবে এটি অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তন্তুর সমষ্টি। এদের বলা হয় ‘অ্যাক্সন’ বা স্নায়ুতন্তু। এই অ্যাক্সনগুলো আসলে ‘নিউরন’ বা স্নায়ুকোষের লম্বাটে অংশ। নিউরন হলো আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মূল একক।
অ্যাক্সনগুলো আমাদের শরীরে বৈদ্যুতিক বার্তার বাহক হিসেবে কাজ করে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যাকশন পটেনশিয়াল’ (Action Potential)। আমাদের ত্বক বা অন্যান্য টিস্যু থেকে যখন কোনো অনুভূতি এই তন্তুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে যায়, তখন তাকে বলা হয় ‘অ্যাফারেন্ট ফাইবার’। আবার মস্তিষ্ক থেকে যখন কোনো আদেশ পেশি বা গ্রন্থির দিকে আসে, তখন তাকে বলা হয় ‘ইফারেন্ট ফাইবার’।
স্নায়ুর মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান কতটা দ্রুত হতে পারে? গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাক্সনগুলো প্রতি সেকেন্ডে ০.৫ থেকে ১০০ মিটার বেগে সংকেত পাঠাতে পারে। এই গতি নির্ভর করে অ্যাক্সনের ব্যাস এবং তার ওপর থাকা ‘মায়োলিন শিথ’ (Myelin Sheath) নামক এক ধরনের চর্বিযুক্ত নিরোধক আবরণের ওপর। মায়োলিন থাকলে সংকেত চলাচলের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অতি ক্ষুদ্র অ্যাক্সনগুলো দৈর্ঘ্যে অবিশ্বাস্য রকম লম্বা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পায়ের আঙুলের ডগা থেকে মস্তিষ্কের গোড়া পর্যন্ত একটি একক সংকেত বহনকারী অ্যাক্সন বিস্তৃত থাকতে পারে। ঠিক তেমনি, আমাদের মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্স থেকে মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে অন্য একটি অ্যাক্সন।
একটি সাধারণ কোষের মতো নিউরনেরও একটি কোষদেহ, নিউক্লিয়াস এবং সাইটোপ্লাজম থাকে। তবে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর তন্তুময় গঠন। নিউরনের কোষদেহ ঘিরে থাকে ‘ডেনড্রাইট’ নামক ছোট ছোট শাখা-প্রশাখা, যা দেখতে অনেকটা ঝোপের মতো। সাধারণত একটি কোষে একটিই অ্যাক্সন থাকে, যা সংকেত পরিবহনের পাশাপাশি রাসায়নিক বার্তা নিঃসরণ করে।
দুটি নিউরনের মিলনস্থলকে বলা হয় ‘সিন্যাপস’ (Synapse)। এখানে দুটি কোষের মাঝে অতি সূক্ষ্ম একটি ফাঁকা জায়গা থাকে, যাকে বলা হয় সিন্যাপটিক ক্লেফট। যখন একটি বৈদ্যুতিক সংকেত অ্যাক্সনের প্রান্তে পৌঁছায়, তখন সেখানে থাকা ‘সিন্যাপটিক ভেসিকল’ বা ক্ষুদ্র থলি থেকে রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়। এই রাসায়নিক পদার্থগুলোকে বলা হয় ‘নিউরোট্রান্সমিটার’।
আমাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার রয়েছে। যেমন— অ্যাসিটাইলকোলিন, নরঅ্যাড্রেনালিন এবং গ্লুটামেট আমাদের স্নায়ুকে উত্তেজিত করতে সাহায্য করে। আবার গ্লাইসিন ও গামা-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড (GABA) স্নায়ুর উত্তেজনা কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বিজ্ঞানের পরিভাষার বাইরেও ‘নার্ভ’ বা স্নায়ু শব্দটি আমাদের দৈনন্দিন ভাষায় ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। আমরা প্রায়ই বলি, “পরীক্ষার আগে নার্ভাস লাগছে” বা “সে খুব সাহসী, ওর নার্ভ খুব শক্ত”। এখানে শব্দটি দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা মানসিক স্থিরতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যদিও এটি একটি সাধারণ ব্যবহার, তবুও এটি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয় যে— আমাদের আবেগ, চরিত্র এবং মানসিক অবস্থা আসলে আমাদের এই জটিল স্নায়ুতন্ত্রেরই প্রতিফলন।
পরিশেষে, আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি স্পন্দন, প্রতিটি চিন্তা আর অনুভূতির মূলে রয়েছে এই সূক্ষ্ম সুতোর মতো স্নায়ুগুলো। এদের সুস্থতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হলো দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।

