অঙ্গ প্রতিস্থাপন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক চরম উৎকর্ষ। এটি এমন এক উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি যা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিগূঢ় মানবিক সত্য—অঙ্গ প্রতিস্থাপন শুধু যন্ত্র বা ওষুধের ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে মানুষের মহানুভবতার ওপর। সম্প্রতি অঙ্গ সংগ্রহের বৈশ্বিক এবং সাংগঠনিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হলেও দাতার সংকট এবং নীতিগত জটিলতা এখনো এই ব্যবস্থার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অঙ্গ প্রতিস্থাপন কোনো সাধারণ চিকিৎসা নয়। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এতে উচ্চতর জৈবপ্রযুক্তি ও একদল উচ্চশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, প্রতিস্থাপন মানেই পূর্বের সুস্বাস্থ্যের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়। একজন গ্রহীতাকে জীবনভর অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিপজ্জনক ওষুধ সেবন করে যেতে হয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ‘দান’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজন তরুণ বা সুস্থ ব্যক্তির আকস্মিক মৃত্যু (যেমন সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা বা সহিংসতা) থেকে এই অঙ্গগুলো সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ, একজনের শোকাবহ বিয়োগান্তক ঘটনাই অন্যজনের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে। অঙ্গ সংগ্রহকারী সংস্থাগুলো মূলত এই মানবিক ট্র্যাজেডি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।
অাশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে মৃতদেহের কিডনি প্রতিস্থাপনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এই হার অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে ৩,৬৮১টি ক্যাডেভেরিক (মৃতদেহ থেকে সংগৃহীত) কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, যা ২০০১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৮,২০৩টিতে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে দাতার সংখ্যা বাড়লেও চাহিদার তুলনায় তা সামান্য।
ইউরোপের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। ইউরোট্রান্সপ্ল্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলোতে কাজ করে। ২০০০ সালে এই অঞ্চলে প্রায় ১৯,০০০ কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যা সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি ছিল। বিশেষ করে স্পেনের মডেলটি এখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ১,৩৫০ জন দাতা পাওয়া যায়—যা ইউরোপে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, জাপানের মতো উন্নত দেশে ব্রেন-ডেথ নিয়ে সাংস্কৃতিক অনীহা এবং মৃতদেহ অক্ষত রাখার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অঙ্গ প্রতিস্থাপন ব্যবস্থা এখনো সেভাবে বিকশিত হতে পারেনি।
অঙ্গ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিবর্তনীয় শর্ত হলো ‘ব্রেন ডেথ’ বা মস্তিষ্কের মৃত্যু। হৃদপিণ্ড সচল থাকা অবস্থায় কিন্তু মস্তিষ্কের কাজ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলেই কেবল অঙ্গগুলো সতেজ অবস্থায় সংগ্রহ করা সম্ভব। ২০০০ সালের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৪৩ শতাংশ দাতা মারা গেছেন মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে এবং ৪১ শতাংশ মারা গেছেন স্ট্রোকে।
বর্তমানে কিডনি ছাড়াও লিভার, হার্ট, অগ্ন্যাশয় এবং ফুসফুস প্রতিস্থাপনের হার দ্রুত বাড়ছে। আশির দশকে যেখানে একজন দাতা কেবল একটি অঙ্গ (সাধারণত কিডনি) দিতেন, বর্তমানে প্রায় ৭৬ শতাংশ দাতা একাধিক অঙ্গ দান করছেন। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। এছাড়া আগে বয়স ৫০-এর বেশি হলে কাউকে দাতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো না, কিন্তু বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সী ব্যক্তির অঙ্গও সফলভাবে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে।
অঙ্গদানের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ইতিবাচক মনোভাব থাকা অত্যন্ত জরুরি। জরিপ দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ অঙ্গদানকে সমর্থন করে। তবে এই সমর্থনের হার সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ ও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার বেশি হলেও আফ্রিকান-আমেরিকান বা নিম্নবিত্তদের মধ্যে কিছুটা সংশয় লক্ষ্য করা যায়। আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে এই সমর্থন প্রায় ৮০ শতাংশ।
দাতা পরিবারের সদস্যরা সাধারণত দুটি কারণে অঙ্গদানে রাজি হন:
১. অন্য একজনের জীবন বাঁচানোর তীব্র ইচ্ছা।
২. প্রিয়জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়েও কোনো মহৎ কাজ বেঁচে থাকুক—এই সান্ত্বনা পাওয়া।
বিপরীতে, যারা অঙ্গদানে অমত পোষণ করেন, তাদের প্রধান কারণ হলো চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব। অনেকে ভয় পান যে, অঙ্গদানের অনুমতি দিলে হয়তো চিকিৎসকরা রোগীকে বাঁচানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করবেন না। এছাড়া ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক বিশ্বাসও বড় ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গ প্রতিস্থাপন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে ১৯৮৪ সালে ‘ন্যাশনাল অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট অ্যাক্ট’ পাস করা হয়। বর্তমানে এটি সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং অঙ্গগুলোকে ‘জনসাধারণের সম্পদ’ (Public Resource) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি চাইলে অঙ্গ কেনা-বেচা করতে পারে না, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
ইউরোপের অনেক দেশে ‘প্রিজুমড কনসেন্ট’ (Presumed Consent) বা ‘অনুমিত সম্মতি’ আইন চালু আছে। এর মানে হলো, যদি কেউ জীবদ্দশায় অঙ্গদানে আপত্তি জানিয়ে না যান, তবে মৃত্যুর পর তাকে দাতা হিসেবে ধরা হবে। অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম এবং স্পেনে এই নিয়ম চালু থাকায় সেখানে দাতার সংখ্যা অনেক বেশি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারের চূড়ান্ত সম্মতি এখনো নেওয়া হয়।
অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি এখন হাড়, লিগামেন্ট এবং চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বা টিস্যু ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অঙ্গ সংগ্রহের তুলনায় টিস্যু সংগ্রহের নিয়মগুলো কিছুটা শিথিল হলেও বর্তমানে এই খাতে সরকারি তদারকি বাড়ছে, যাতে এই প্রক্রিয়ায় কোনো সংক্রামক রোগ (যেমন এইচআইভি বা হেপাটাইটিস) ছড়িয়ে না পড়ে।
অঙ্গ প্রতিস্থাপন আজ কেবল বিজ্ঞান নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের লিভার বা হার্ট বদলে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ‘উপহারটি’ আসতে হবে একজন মানুষের হৃদয় থেকেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হলো—চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়ানো এবং প্রতিটি সম্ভাব্য দাতার পরিবারের কাছে সময়মতো পৌঁছানো। তবেই মৃত্যুর ছাই থেকে অন্য এক জীবনে প্রাণের আলো জ্বালানো সম্ভব হবে।

