Friday, May 8, 2026
35.1 C
Bangladesh

পৃষ্ঠায় শুরু, পর্দায় পরিপূর্ণতা: এক শতাব্দীর রূপান্তর।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি অতি পরিচিত বিতর্ক হলো—‘বইটি কি সিনেমার চেয়ে বেশি ভালো ছিল?’ দর্শক বা সমালোচক ভেদে এর উত্তর ভিন্ন হলেও, চলচ্চিত্র এবং সাহিত্যের এই গভীর সম্পর্ক আজ থেকে শুরু হয়নি। বরং ১৮৯৫ সালে যখন লুই লুমিয়ের প্রথম ফিকশন চলচ্চিত্র ‘এল’আরোজুর আরোজ’ (L’arroseur arrosé) নির্মাণ করেন, সেটিও ছিল ১৮৮৯ সালের একটি কমিক স্ট্রিপের রূপান্তর। অর্থাৎ, চলচ্চিত্রের জন্মের লগ্ন থেকেই এটি অন্য শিল্পমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে বিকশিত হয়েছে। আজ শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও সেই ‘ফিদেলিটি’ বা বিশ্বস্ততার প্রশ্নটি চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

ঐতিহ্যের শেকড় চলচ্চিত্রের আদি যুগে যখন চিত্রনাট্য লেখার কোনো আলাদা পেশাদার কাঠামো তৈরি হয়নি, তখন নির্মাতারা হাত বাড়িয়েছিলেন ধ্রুপদী সাহিত্য এবং মঞ্চনাটকের দিকে। এর পেছনে শৈল্পিক কারণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক কারণও ছিল। একদিকে যেমন শেক্সপিয়র বা ডিকেন্সের গল্পের ওপর ভিত্তি করে ছবি বানালে কপিরাইট সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো যেত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত গল্পগুলো পর্দায় তুলে ধরলে দর্শক আকর্ষণ করা সহজ হতো।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এডুইন এস. পোর্টারের ‘দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি’ (১৯০৩) বা ‘ড্রিম অফ আ রেয়ারবিট ফিয়েন্ড’ (১৯০৬)-এর মতো ছবিগুলো সমসাময়িক থিয়েটার এবং কমিক স্ট্রিপ থেকেই তাদের রসদ সংগ্রহ করেছিল। এই প্রবণতা কেবল আমেরিকায় সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্রিটেন এবং ইউরোপেও জোলা, তলস্তয় বা গ্যেটের মতো কালজয়ী লেখকদের সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল।

একটি সিনেমা মূল সাহিত্যের প্রতি কতটা অনুগত থাকবে, তা নিয়ে চলচ্চিত্র তাত্ত্বিকরা সাধারণত তিনটি ধারায় ভাগ করেন: কঠোর (Strict), শিথিল (Loose) এবং মুক্ত (Free) রূপান্তর।

অনেক সময় দেখা যায়, স্ট্যানলি কুবরিকের মতো নির্মাতারা মূল উপন্যাসের নির্যাস নিয়ে নিজের মতো করে নতুন কোনো দর্শন তুলে ধরেন। ১৯৭১ সালে ‘এ ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’ মুক্তির পর মূল লেখক অ্যান্থনি বার্গেস এটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, কুবরিক বইয়ের মূল সুর বাদ দিয়ে ভায়োলেন্স বা নেতিবাচক দিকগুলো বেশি ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে চলচ্চিত্র হিসেবে কুবরিকের কাজটি আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এর বিপরীতে পিটার জ্যাকসনের ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ ট্রিলজি একটি বিরল উদাহরণ, যেখানে তিনি টলকিনের বিশাল পৃথিবীকে যেমন বিশ্বস্ততার সাথে তুলে ধরেছেন, তেমনি চলচ্চিত্র হিসেবেও সেটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

শুরুর দিকে চলচ্চিত্র ছিল মাত্র ৩ থেকে ৫ মিনিটের। ফলে ডিকেন্সের বিশাল উপন্যাস বা শেক্সপিয়রের জটিল নাটকগুলোর মূল অংশ বা নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্য (যেমন: নিকোলাস নিকলবি’র সেই বিখ্যাত স্কুল সিন) ছাড়া পুরো গল্প বলা অসম্ভব ছিল। ১৯১০ সাল নাগাদ দৈর্ঘ্য বাড়তে শুরু করলে ২০ মিনিটের মধ্যে পুরো উপন্যাস সংকুচিত করে ফেলার এক প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখা যায়। ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ (১৯১০) বা ‘ডন কিহোতে’ (১৯১৫)-এর মতো কাজগুলো এভাবেই নির্মিত হয়েছিল।

সেই সময়কার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল আকাশচুম্বী। ক্যামেরা ছিল স্থির, দৃশ্যগুলো থাকতো দূর থেকে তোলা স্ট্যাটিক ছবির মতো। কিন্তু ১৯১০-এর দশকের শেষের দিকে ক্যামেরা মুভমেন্ট, নতুন অ্যাঙ্গেল এবং সৃজনশীল এডিটিং আসার পর চলচ্চিত্র একটি পরিণত শিল্পমাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ডি.ডব্লিউ গ্রিফিথের ‘দ্য বার্থ অফ আ নেশন’ (১৯১৫) দীর্ঘস্থায়ী কাহিনীচিত্রের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ল্যাসিক সাহিত্যের চেয়ে ডিটেকটিভ, গ্যাংস্টার বা সায়েন্স ফিকশনের মতো ‘জনপ্রিয়’ ঘরানার সাহিত্য রূপান্তর করা নির্মাতাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক। কারণ, এসব ক্ষেত্রে পাঠকদের গোঁড়ামি কম থাকে এবং নির্মাতারা নিজেদের সৃজনশীলতা ব্যবহারের সুযোগ পান। ফরাসি নিউ ওয়েভ বা নবতরঙ্গের অনেক চলচ্চিত্রকার ‘পাল্প ফিকশন’ বা গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে কাজ করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

স্টিলারের মতো নির্মাতারা যখন সেলমা ল্যাগারলফের উপন্যাস থেকে সিনেমা বানিয়েছেন, তখন তা কেবল রূপান্তর থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে এক নতুন কবিতা। আবার কার্ল থিওডোর ড্রায়ারের ‘দ্য প্যাশন অফ জোয়ান অফ আর্ক’ (১৯২৮) চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে কারণ এর প্রতিটি সংলাপ নেওয়া হয়েছিল জোয়ান অফ আর্কের আসল বিচারের ট্রান্সক্রিপ্ট থেকে।

একটি সার্থক রূপান্তর কি কেবল মূল বইয়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা? নাকি এটি এমন একটি সৃষ্টি হওয়া উচিত যা মূল সূত্র না পড়েও বোঝা যায়? বর্তমান বিশ্বের চলচ্চিত্র সমালোচকরা মনে করেন, সিনেমাকে কেবল সাহিত্যের আয়না হলে চলে না, তাকে হতে হয় স্বকীয়।

অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, জেন অস্টেনকে নিয়ে নির্মিত ‘ক্লুলেস’ বা শেক্সপিয়রকে নিয়ে নির্মিত ‘জো ম্যাকবেথ’ প্রমাণ করে যে, মাধ্যম বদলে গেলেও গল্পের আবেদন ফুরায় না। সিনেমার শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত যে রূপান্তরের যাত্রা, তা মূলত এক শিল্প থেকে অন্য শিল্পে হৃদস্পন্দনের সঞ্চালন।


তথ্যসূত্র:
★বেন, মারভিন এন., এবং রিচার্ড জে. সুপারফাইন। ১৯৯৪। “§ ১১৭— অভিযোজনের চতুর্থ প্রজন্মের অধিকার এবং সোর্স কোড জেনারেটরের দ্বিধা।” জন মার্শাল কম্পিউটার ও তথ্য আইন জার্নাল ৫৩৭।

★মিলার, আর্থার আর., এবং মাইকেল এইচ. ডেভিস। ২০০০। ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি: পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক, এবং কপিরাইট ইন এ নাটশেল। ৩য় সংস্করণ। সেন্ট পল, মিনেসোটা: ওয়েস্ট গ্রুপ।

★প্লটকিন, মার্ক ই., সম্পাদক। ২০০৩। ই-কমার্স ল অ্যান্ড বিজনেস। নিউ ইয়র্ক: অ্যাসপেন।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...