Friday, May 8, 2026
35.1 C
Bangladesh

হিন্দুধর্মে গোমাংস ভক্ষণ,শাস্ত্র, ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

সনাতন ধর্ম বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জীবনবিধান। এই ধর্মের বিবর্তন হাজার হাজার বছরের। বর্তমান সময়ে হিন্দুধর্মে গরু অত্যন্ত পবিত্র এবং আরাধনার বস্তু হলেও, ইতিহাসের পাতায় এর ভক্ষ্য-অভক্ষ্য নিয়ে নানা মতভেদ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ঋগ্বেদীয় যুগ থেকে শুরু করে মনুস্মৃতি এবং আধুনিক পৌরাণিক যুগ পর্যন্ত গরুর অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।

অনেকে দাবি করেন যে, বৈদিক যুগে ঋষি ও দেবতারা গরু খেতেন। এই দাবির মূলে রয়েছে ঋগ্বেদ এবং অথর্ববেদের কিছু সূক্তের ব্যাখ্যা।

ঋগ্বেদের কিছু শ্লোকে (যেমন: ১০.৮৬.১৪) উল্লেখ পাওয়া যায় যে, দেবরাজ ইন্দ্রের জন্য অনেক সময় ষাঁড় বলি দেওয়া হতো। একইভাবে অগ্নিকে ‘উক্ষান্ন’ (যার খাদ্য ষাঁড়) বা ‘বশান্ন’ (যার খাদ্য বন্ধ্যা গাভী) বলা হয়েছে।

অতিথি সৎকার (গঘ্ন): প্রাচীন ভারতে অতিথিকে ‘গঘ্ন’ বলা হতো। এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘যার জন্য গরু হত্যা করা হয়’। পাণিনির ব্যাকরণ এবং গৃহ্যসূত্রগুলোতেও মধুপর্ক (অতিথিকে আপ্যায়নের বিশেষ খাবার) হিসেবে মাংসের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে এখানে একটি বিশাল তাত্ত্বিক পার্থক্য আছে। অনেক পণ্ডিতের মতে, প্রাচীন সংস্কৃত শব্দগুলোর অর্থ সময়ের সাথে বদলে গেছে। ‘অঘ্ন্যা’ (যা বধযোগ্য নয়) শব্দটি ঋগ্বেদে অন্তত ১৬ বার গরুর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, বৈদিক যুগে গরু যে কেবল ভোজ্য ছিল তা নয়, বরং তাকে রক্ষা করার জন্য কড়া নির্দেশও ছিল।

হিন্দুশাস্ত্রে গরুকে রক্ষার নির্দেশটি মূলত তার উপযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কৃষিপ্রধান সমাজে বলদ চাষের জন্য এবং গাভী দুধের জন্য অপরিহার্য ছিল। অথর্ববেদে গরুকে ‘পৃথিবীর মাতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

শাস্ত্রমতে, গরুর শরীরে ৩৩ কোটি (মতান্তরে ৩৩ প্রকার) দেবতার বাস। এই বিশ্বাসের মূলে রয়েছে গরুর পঞ্চগব্য (দুধ, দধি, ঘি, গোবর ও গোমূত্র), যা কেবল পুষ্টিকরই নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শুদ্ধিকরণের কাজে ব্যবহৃত হয়।

হিন্দুধর্মে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিবর্তন বুঝতে গেলে কয়েকটি পর্যায় লক্ষ্য করতে হয়:

পর্যায়দৃষ্টিভঙ্গিমূল রেফারেন্স বৈদিক যুগ যজ্ঞীয় বলি এবং বিশেষ প্রয়োজনে ভক্ষণ।ঋগ্বেদ, শতপথ ব্রাহ্মণ।ধর্মসূত্র ও মনুস্মৃতি মাংস খাওয়ার অনুমতি থাকলেও গোমাংসের ওপর কড়াকড়ি শুরু।মনুস্মৃতি ৫.২৭-৪৪।পৌরাণিক যুগ গরুকে সম্পূর্ণ দেবতা ও মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা।মহাভারত, ভাগবত পুরাণ।

মহাভারতের শান্তিপর্বে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “গোরক্ষাই হলো পরম ধর্ম।” সেখানে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি গরু হত্যা করে, সে ঘোর নরকে পতিত হয়। শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেই গো-সেবা ও গো-পালনের ওপর জোর দিয়েছেন এবং তিনি ‘গোপাল’ নামে পরিচিত হয়েছেন।

এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রে রয়েছে যজ্ঞ। প্রাচীনকালে যজ্ঞে পশুবলির বিধান ছিল। তবে স্বামী বিবেকানন্দের মতো মণীষীরা উল্লেখ করেছেন যে, একসময় গোমাংস ভক্ষণ প্রচলিত থাকলেও পরবর্তীতে তা নিষিদ্ধ করা হয় কারণ সমাজ বুঝতে পেরেছিল যে একটি মৃত গরুর চেয়ে একটি জীবিত গরু সমাজের জন্য বেশি উপকারী।

অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে, বেদে যেখানে মাংস খাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে গরু বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘ষাঁড়’ বোঝানো হতো এবং তা ছিল কেবল বিশেষ যজ্ঞীয় অনুষ্ঠান। সাধারণ মানুষের জন্য গরু খাওয়া কখনই সাধারণ খাদ্যাভ্যাস ছিল না।

বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থানের সময় ‘অহিংসা’ তত্ত্বটি প্রবল হয়ে ওঠে। হিন্দুধর্মও এই মহান তত্ত্বকে গ্রহণ করে এবং পশুবলি কমিয়ে দেয়।
ভারত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। গরু ছিল অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তাই গরুকে রক্ষা করা ধর্মীয় আবশ্যিকতায় পরিণত হয়।
গরু যেমন নিঃস্বার্থভাবে দুধ দেয়, তেমনি তাকে মাতার আসনে বসানো হয়েছে। নিজের মাকে খাওয়া যেমন অকল্পনীয়, সনাতনীদের কাছে গোমাংস খাওয়াও তেমনি পাপ হিসেবে গণ্য হতে থাকে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বৈদিক সাহিত্যের কিছু জায়গায় যজ্ঞীয় প্রেক্ষাপটে পশুর উল্লেখ থাকলেও, পরবর্তী সমস্ত শাস্ত্র (পুরাণ, স্মৃতি, উপনিষদ) গরুকে পবিত্র এবং অবধ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে কোনো সনাতন ধর্মাবলম্বীর জন্য গরু খাওয়া শাস্ত্রীয়ভাবে অনুমোদিত নয়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও আবেগীয় পরিচয়।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...