দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে দেশের ভোটাররা নতুন সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদের ওপর একটি জাতীয় গণভোটেও অংশ নেবেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। সেলক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকল প্রার্থীদের প্রাথমিক নির্বাচনী কার্যক্রম শেষে তারা এখন প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। যার মধ্যে নতুন করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৪৫ লাখ ৭১ হাজার ২১৬ জন ভোটার। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ভোটার পুরুষ। আর ২৭ লাখ নারী ভোটার। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২৫১ জন। সবমিলিয়ে মোট ভোটারের ৩৪ শতাংশই নতুন ভোটার। এর মধ্যে তরুণ ভোটার এবং প্রবাসীদের অংশগ্রহণ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৮ লাখ প্রবাসী ইতিমধ্যে নিবন্ধন করেছেন। আর তারাই নির্বাচনে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দৃশ্যপটেও এবার দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে লড়াইটি প্রধানত হতে যাচ্ছে তিনটি ধারায়: বিএনপি ও তার জোট: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী: দীর্ঘ বিরতির পর একক শক্তি হিসেবে বড় আকারে নির্বাচনে ফিরেছে দলটি। জাতীয় নাগরিক দল (NCP): জুলাই বিপ্লবের মূল সমন্বয়ক ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী এই নতুন রাজনৈতিক শক্তিটি বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যারা জোট বেধেছে জামায়াতে ইসলামীর সাথে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তরুণ ভোটারসহ সকল ভোটাররাই পরিবর্তনের আশায় রয়েছে। তারা পূর্বের ন্যায় রাজনীতি দেখতে পছন্দ করছেন না। কর্মসংস্থানের সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা, সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও আধুনিক নাগরিক সুবিধা ভোটারদের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের মাঝেও এই নির্বাচনকে নিয়ে আশা দানা বাঁধছে।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ৬৪ জেলায় প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া বিজিবি, পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবে। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানিয়েছেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের সহিংসতা বরদাশত করা হবে না এবং মাঠ পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী সিভিল প্রশাসনকে সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে।
নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় তাঁদের স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের এমন ব্যস্ত দিন কাটছে। ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাঁরা ভোট প্রার্থনা করছেন। তাঁদের কাছে পেয়ে খুশি ভোটাররাও।
ভোটারকে দুটি ব্যালট দেওয়া হবে। একটি হলো সাদা ব্যালট, যা মূলত সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য। অপরটি গোলাপি ব্যালট, যা সংবিধান সংস্কারের ‘জুলাই চার্টার’ এর ওপর ‘হ্যাঁ/না’ ভোট বা গণভোটের জন্য। “এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের নয়, বরং একটি নতুন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর”—এমনটাই মনে করছেন রাষ্ট্র বিশ্লেষক ও তরুণ ভোটাররা।
আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। ইসি সূত্রে জানা যায়, সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৬৬টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব কেন্দ্রে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি বুথ থাকবে। আসন্ন নির্বাচনে সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার দায়িত্বে থাকবেন।
(রাকিবুল ইসলাম রাফি, এপিক ভার্স জার্নাল)

