জাপানের উত্তরাঞ্চল জুড়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ তুষারঝড় বা ‘স্নো স্টর্ম’ এখন এক বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। গত কয়েকদিনের রেকর্ড ব্রেকিং তুষারপাতে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া তুষারঝড় সংক্রান্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ৪০০ মানুষ।
মৃতদের মধ্যে একটি বড় অংশই স্থানীয় বয়স্ক নাগরিক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে যখন মানুষ তাদের ঘরবাড়ির ছাদ থেকে জমে থাকা ভারী তুষার পরিষ্কার করার চেষ্টা করছিলেন। বরফ সরাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে বা বরফের স্তূপের নিচে চাপা পড়েই এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো ঘটেছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে যাওয়া ছাদগুলো অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে থাকায় সামান্য অসাবধানতাতেই বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না দেশটিতে ঘুরতে আসা বিদেশি পর্যটকরাও। সম্প্রতি দুটি পৃথক হৃদয়বিদারক ঘটনায় দুজন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। হোক্কাইডোর বিশ্ববিখ্যাত নিসেকো রিসর্টে স্কি করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণ হারান মেলবোর্নের ২৭ বছর বয়সী যুবক মাইকেল হার্স্ট। অন্যদিকে, নাগানো প্রদেশের একটি রিসর্টে স্কি লিফটে ব্যাকপ্যাক আটকে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ২২ বছরের তরুণী ব্রুক ডের। এই ঘটনাগুলো পর্যটকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
তুষারপাতের তীব্রতায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, দুর্গত এলাকার প্রায় ১,৭০০-এর বেশি ঘরবাড়ি বর্তমানে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে। রেললাইনের ওপর কয়েক ফুট পুরু বরফ জমে যাওয়ায় জাপানের বিখ্যাত বুলেট ট্রেনসহ সাধারণ ট্রেন চলাচলও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ একপ্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আবহাওয়া দপ্তরের নতুন পূর্বাভাস। আগামী কয়েকদিনে তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি স্বস্তির খবর মনে হলেও, জাপানের সরকারি কর্মকর্তারা একে ‘আসন্ন মহাবিপদ’ হিসেবে দেখছেন। তাপমাত্রা বাড়লে জমে থাকা বিশাল বরফের স্তূপ গলতে শুরু করবে, যা ভয়াবহ ‘তুষারধস’ বা অ্যাভালাঞ্চ (Avalanche) এর কারণ হতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বরফ গলে রাস্তাঘাট অত্যন্ত পিচ্ছিল ও বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠবে। তাই নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। বিশেষত যারা বাধ্য হয়ে ছাদের বরফ পরিষ্কার করছেন, তাদের অবশ্যই হেলমেট এবং সেফটি রোপ বা লাইফলাইন ব্যবহারের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত বছর পুরো শীত মৌসুমে জাপানে তুষারপাতে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এবার মৌসুমের মাঝামাঝেই পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে এবারের শীত অতীতের সব ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সপ্তাহান্তে আরও ভারী তুষারপাতের পূর্বাভাস থাকায় জরুরি বিভাগগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।

