বাংলাদেশের আভিজাত্য এবং ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হলো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা। এটি কেবল একটি হোটেল নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু চড়াই-উত্তরাইয়ের এক নীরব সাক্ষী।
অতীতের পৃথিবীতে হোটেলের কোনো প্রয়োজন ছিল না। সম্রাট, বিত্তশালী রাজা ও ধনবান জমিদাররা দূর-দূরান্তের পথিক ও মুসাফিরদের জন্য তৈরি করেন ছিমছাম, সাজানো-গোছানো পান্থশালা। নিরাপদে রাত্রি যাপনের জন্য এসব পান্থশালায় আতিথেয়তা গ্রহণ করতো সেসব মানুষজন।
সময়ের নীরব স্রোতে একসময় বিলীন হয়ে গেছে এককালের এসব ধনাঢ্য রাজপরিবারের রাজত্বকাল আর পান্থশালা। সময়ের সর্পিল সাঁকো পেরিয়ে পালাবদল ঘটেছে তাদের তৈরি করা রীতি-নীতিতেও। ফলে, কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে এসব পান্থশালার গল্পও। বিপরীতে, বিনে পয়সার পান্থশালার বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠেছে অভিজাত সব হোটেল। ইতিহাসের রোমাঞ্চকর পাতায় জায়গা করে নেওয়া বাংলাদেশের যে হোটেলটি এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে সগৌরবে তার নাম হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল।
রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা হোটেল। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপ (IHG) এর অধীনে এটি পরিচালিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি তার স্থাপত্যশৈলী, বিশ্বমানের আতিথেয়তা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
১৯৬৬ সালে স্থপতি উইলিয়াম বি. তবলারের নকশায় এই হোটেলটি যাত্রা শুরু করে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল গ্রুপ ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত এই হোটেলের ব্যবস্থাপনায় ছিল। ইন্টারকন্টিনেন্টালের পর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয় আন্তর্জাতিক হোটেল সেবাদানকারী অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ‘শেরাটন’। ২৮ বছর পর ২০১১ সালের এপ্রিলে শেরাটন দায়িত্ব ছেড়ে দেয় হোটেলটির। পরবর্তীতে দেশীয় সরকারি কোম্পানি বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড ‘রূপসী বাংলা’ নামে নিজেই হোটেলটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ইন্টারকন্টিনেন্টালের সঙ্গে চুক্তি সই করার দুই বছর পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয় এর সংস্কারকাজ। সংস্কার কার্যক্রমে নতুনত্ব দিয়ে ঢেলে সাজানো হয় হোটেলটির ভেতরের অংশ। হোটেলটি সাজানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মোগল স্থাপত্যশৈলীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্কারের পর ২০১৮ সালে এটি পুনরায় তার আদি নাম ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল’ ফিরে পায়।
আধুনিকতা ও দেশীয় ঐতিহ্যের মিশেলে হোটেলটিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান আকর্ষণ বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক মানের ২২৬ সুসজ্জিত কক্ষ, দুটি বলরুম ও সাতটি সভাকক্ষ, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্বাদের বিভিন্ন ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট, অলিম্পিক সাইজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত আধুনিক সুইমিং পুল, অত্যাধুনিক জিম এবং স্পা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই হোটেলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধের সময় এটিকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ (Neutral Zone) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং যার লেখনীর মাধ্যমেই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বাঙালি নিধনযজ্ঞের খবর বিশ্ববাসী জানতে পারে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও রেড ক্রসের কর্মকর্তারা এখান থেকেই যুদ্ধের খবরাখবর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতেন। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির বীভৎসতা অনেক বিদেশি সাংবাদিক এই হোটেলের জানালা দিয়েই প্রত্যক্ষ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবরুদ্ধ ঢাকায় প্রথম গেরিলা আক্রমণটি সংঘটিত হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই। হাবিবুল আলম বীর প্রতীকের নেতৃত্বে একাত্তরের ৯ জুন সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে রাত ৮টার মধ্যে সংঘটিত এই গেরিলা অপারেশনটির নাম ছিল ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল: হিট অ্যান্ড রান’। সেই অপারেশনটি ছিল একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকার বুকে প্রথম বড় ধরনের কোনো গেরিলা আক্রমণ। এটি কেবল একটি হামলা ছিল না, বরং বিশ্ববাসীকে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া ছিল যে, “ঢাকা এখনো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই।”
এছাড়াও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করতে এই হোটেলের অবদান অনস্বীকার্য। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও ভিআইপি অতিথিদের প্রথম পছন্দ হিসেবে এটি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার ও বিজনেস কনফারেন্স আয়োজনের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নতুন নতুন হোটেল নিঃসন্দেহে সবার কাছেই রোমাঞ্চকর। তবে আভিজাত্যের সঙ্গে তুলনা চলে না কোনও কিছুর। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে হোটেলটিতে।
সময় গড়িয়ে যায়, নতুনত্বের পানে ধেয়ে চলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের গল্প। সগৌরবে টিকে রয় হোটেলটি। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গৌরবের অংশীদার। এর আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের মিশেল একে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হোটেলের মর্যাদা দিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঢাকার ঐতিহ্যের ধারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
(তথ্য সংগ্রহ ও লেখা, রাকিবুল ইসলাম রাফি)

