পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে পাহাড়ের গঠন ও এর কাজ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আয়াতটি হলো সূরা আন-নাবার ৬ ও ৭ নম্বর আয়াত:
“আমি কি জমিনকে বিছানা এবং পাহাড়সমূহকে পেরেক (খুঁটি) বানাইনি?” (সূরা আন-নাবা, ৭৮:৬-৭)
এখানে আল্লাহ তাআলা আরবি ‘আওতাদ’ (Awtad) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ‘আওতাদ’ শব্দটি ‘ওয়াতাদুন’-এর বহুবচন, যার আক্ষরিক অর্থ হলো তাবু টানানোর জন্য ব্যবহৃত খুঁটি বা পেরেক, যার একটি বড় অংশ মাটির নিচে প্রোথিত থাকে।
এছাড়াও সূরা আন-নাহল (১৬:১৫), সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৩১) এবং সূরা লুকমানে (৩১:১০) বলা হয়েছে যে, পৃথিবীতে পাহাড় স্থাপন করা হয়েছে যাতে পৃথিবী মানুষকে নিয়ে দুলতে না পারে বা ভারসাম্যহীন না হয় (রওয়াসিয়া)।
ভূতত্ত্ব (Geology) কী বলে?
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ভূতত্ত্ববিদরা মনে করতেন পাহাড় কেবল মাটির ওপরের একটি উঁচু ঢিবি। কিন্তু ‘প্লেট টেকটোনিক্স’ (Plate Tectonics) তত্ত্বের বিকাশ এবং সিসমোলজির উন্নতির পর বিজ্ঞানের ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়।
১. পাহাড়ের গভীর মূল (Isostasy)
আধুনিক ভূ-বিজ্ঞান অনুসারে, পাহাড়ের যতটুকু অংশ আমরা মাটির ওপরে দেখি, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অংশ মাটির গভীরে ‘শিকড়’ বা ‘মূল’ হিসেবে অবস্থান করে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে স্যার জর্জ এরি (Sir George Airy) এবং জন প্র্যাট (John Pratt) পাহাড়ের এই গভীর মূল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেন, যাকে পরবর্তীতে ‘আইসোস্ট্যাসি’ (Isostasy) বলা হয়।
একটি পেরেক যেভাবে কাঠের বা মাটির ভেতরে ঢুকে থেকে উপরের বস্তুকে আটকে রাখে, পাহাড়ও ঠিক তেমনিভাবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ৯ কিলোমিটার হলেও এর মূল বা শিকড় মাটির নিচে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
২. প্লেট টেকটোনিক্স ও স্থিতিশীলতা
পৃথিবীর উপরিভাগ বা লিথোস্ফিয়ার (Lithosphere) কতগুলো বড় বড় খণ্ডে বা প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো যখন একে অপরের দিকে অগ্রসর হয় এবং সংঘর্ষ ঘটে, তখন মাটির ওপরের অংশ ভাঁজ হয়ে পাহাড় তৈরি করে। ভূতাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হয় ‘ফোল্ড মাউন্টেইন’ (Fold Mountain)।
এই পাহাড়গুলো প্লেটগুলোর সংযোগস্থলে একটি ‘অ্যাঙ্কর’ বা নোঙরের মতো কাজ করে, যা পৃথিবীর উপরিভাগকে অত্যধিক কম্পন বা অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে। এটি কুরআনের সেই বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায় যেখানে বলা হয়েছে, পাহাড় স্থাপন করা হয়েছে যাতে পৃথিবী দুলতে না পারে।
ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সপ্তম শতাব্দীতে, যখন বিজ্ঞান আজকের মতো উন্নত ছিল না, তখন মানুষের ধারণা ছিল পাহাড় কেবল মাটির ওপরের একটি বিশাল পাথর। মাটির নিচে যে পাহাড়ের বিশাল অংশ প্রোথিত থাকতে পারে, তা তৎকালীন মানুষের চিন্তার অতীত ছিল। কিন্তু কুরআনে ব্যবহৃত ‘আওতাদ’ শব্দটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।
তৎকালীন আরবদের কাছে ‘ওয়াতাদ’ বা তাবু গাড়ার পেরেক ছিল নিত্যদিনের পরিচিত বস্তু। তারা জানত, একটি পেরেকের সামান্য অংশ উপরে থাকে আর বেশিরভাগ অংশ মাটির নিচে থাকে যাতে তাবু স্থির থাকে। কুরআনের এই উপমা আজ ১৪০০ বছর পর ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের মতামত ও রেফারেন্স
পাহাড়ের এই ভূমিকা সম্পর্কে পৃথিবী বিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদদের মতামত প্রণিধানযোগ্য:
ড. ফ্রাঙ্ক প্রেস (Frank Press): তিনি আমেরিকার ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের বিজ্ঞান উপদেষ্টা ছিলেন। তার বিখ্যাত বই ‘Earth’-এ তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পাহাড়ের আকৃতি অনেকটা পেরেকের মতো এবং এর গভীরে বিশাল শিকড় রয়েছে যা পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখে।
ড. শিয়াভেদা (Professor Siaveda): তিনি একজন জাপানি সামুদ্রিক ভূতত্ত্ববিদ। কুরআনের এই বর্ণনা শুনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান এই তথ্যগুলো মাত্র কয়েক দশক আগে জানতে পেরেছে, কিন্তু ১৪০০ বছর আগে এগুলো কোনো মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল।
পাহাড় কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে? (The Mechanism)
পৃথিবীর অভ্যন্তরে ম্যান্টেল (Mantle) অংশটি অর্ধ-গলিত অবস্থায় থাকে। এর ওপরে টেকটোনিক প্লেটগুলো ভাসমান। পাহাড় যদি না থাকতো, তবে এই প্লেটগুলোর নড়াচড়া অনেক বেশি অনিয়ন্ত্রিত হতো এবং পৃথিবী পৃষ্ঠে ভয়াবহ সব কম্পন সৃষ্টি হতো। পাহাড়গুলো এই প্লেটগুলোকে একে অপরের সাথে গেঁথে রাখতে সাহায্য করে।
পাহাড়ের এই ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানে ‘হাইড্রোকর্ড’ বা চাপের ভারসাম্য রক্ষা হিসেবেও পরিচিত। মাটির ওপরে পাহাড়ের যে বিশাল ভর, তা মাটির নিচের উপাদানের ঘনত্বের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে পুরো ভূখণ্ডকে স্থির রাখে।
উপসংহার: বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের সেতুবন্ধন
পাহাড়কে ‘পেরেক’ বলা কেবল একটি কাব্যিক অলঙ্কার নয়, বরং এটি একটি নিরেট বৈজ্ঞানিক সত্য। কুরআনের বর্ণনা এবং আধুনিক ভূতত্ত্বের এই অভিন্নতা আমাদের দেখায় যে, ধর্মগ্রন্থের তথ্যসমূহ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়।
বিজ্ঞান সবসময় পরিবর্তনশীল; নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের থিওরি আপডেট হয়। কিন্তু পাহাড়ের গঠন নিয়ে কুরআনের দেওয়া তথ্যগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সেই সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, যিনি এই মহাবিশ্ব এবং এর ভূতাত্ত্বিক গঠন সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
১. পবিত্র কুরআন: সূরা আন-নাবা (৭৮:৬-৭), সূরা আন-নাহল (১৬:১৫)।
২. বই: Earth – Frank Press and Raymond Siever.
৩. বই: The Geological Concept of Mountains in the Quran – Dr. Z.R. El-Naggar.
৪. গবেষণা পত্র: Isostasy and the Crustal Structure of Mountains – Journal of Geophysical Research.
৫. ওয়েবসাইট: NASA Earth Observatory (Mountain Formation and Tectonics).

