মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে লোহার অবদান অনস্বীকার্য। ঘর বাড়ির নির্মাণ থেকে শুরু করে মানব জীবনে লোহার অবদান অপরিহার্য । কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই লোহা কোথা থেকে আসলো? সাম্প্রতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ভূতত্ত্বের গবেষণা বলছে, লোহা পৃথিবীর নিজস্ব কোনো উপাদান নয়, বরং এটি এসেছে সুদূর মহাকাশ থেকে। আশ্চর্যজনকভাবে, এই তথ্যটি আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে লোহার উৎপত্তি
আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের (Astrophysics) মতে, লোহা তৈরি হওয়ার জন্য যে পরিমাণ তাপমাত্রার প্রয়োজন, তা পৃথিবীর এমনকি সূর্যের ভেতরেও নেই। একটি লোহার পরমাণু তৈরি হতে প্রায় কয়েকশ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীদের মতে, যখন মহাকাশে কোনো বিশাল নক্ষত্রের (Supernova) মৃত্যু ঘটে, তখন প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ফলে এই বিপুল তাপ সৃষ্টি হয় এবং লোহার উৎপত্তি ঘটে। এই লোহা পরবর্তীতে উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসে জমা হয়েছে। অর্থাৎ, পৃথিবীর লোহা মূলত একটি ‘মহাজাগতিক অতিথি’।
কুরআনের ভাষ্য: ‘নাযিল করা হয়েছে লোহা’
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাদীদের (অধ্যায় ৫৭) ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“…এবং আমি লোহা নাযিল করেছি (অবতীর্ণ করেছি), যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য বহু কল্যাণ।”
এখানে ‘নাযিল’ বা ‘অবতীর্ণ’ শব্দটি ব্যবহারের গুরুত্ব অপরিসীম। আরবিতে ‘আনযালনা’ (Anzalna) শব্দটি মূলত ওপর থেকে নিচে পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। প্রাচীনকালে মানুষ মনে করত লোহা মাটির নিচ থেকেই উৎপন্ন হয়। কিন্তু কুরআনের এই শব্দ চয়ন ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, লোহা আসলে পৃথিবীর বাইরের কোনো উৎস থেকে এসেছে।
গাণিতিক এক অলৌকিকতা
কুরআনের এই সূরার নাম ‘আল-হাদীদ’, যার অর্থ লোহা। মজার বিষয় হলো, ‘আল-হাদীদ’ শব্দের সংখ্যাতাত্ত্বিক মান (Abjad value) হলো ২৬। আধুনিক পর্যায় সারণিতে (Periodic Table) লোহার পারমাণবিক সংখ্যাও (Atomic Number) হলো ২৬। আবার এই সূরাটি কুরআনের ৫৭ নম্বর সূরা। লোহার আইসোটোপগুলোর মধ্যে একটি স্থিতিশীল আইসোটোপের ভর সংখ্যা হলো ৫৭। বিজ্ঞানের সাথে কুরআনের এই নিখুঁত সামঞ্জস্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না বলে মনে করেন অনেক গবেষক।
উপসংহার
বিজ্ঞান যখন ধাপে ধাপে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করছে, তখন দেখা যাচ্ছে অনেক সত্যই শতাব্দী আগে ঐশী গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। লোহা যে আকাশ থেকে এসেছে, তা আজ প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। ধর্ম এবং বিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করে এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনের মহান কারিগরকে চিনতে সাহায্য করে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
কুরআন: সূরা আল-হাদীদ, আয়াত ২৫।
অ্যাস্ট্রোফিজিক্স: Dr. Armstrong (NASA) এর মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক লেকচার।
বই: The First Three Minutes – Steven Weinberg (Nobel Laureate in Physics).
গবেষণা পত্র: The Origin of Heavy Elements, Nature Journal.

