ডায়াবেটিস কেবল রক্তে শর্করার আধিক্য নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে এটি ডেকে আনতে পারে প্রাণঘাতী জটিলতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি জরুরি ও বিপজ্জনক অবস্থার নাম ‘ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস’ বা ডিকেএ (DKA)। মূলত শরীরে ইনসুলিনের চরম ঘাটতি দেখা দিলে রক্তের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং শরীর অতিরিক্ত অম্লীয় বা অ্যাসিডিক হয়ে পড়ে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
কেন হয় এই জটিলতা?
আমাদের শরীর শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে গ্লুকোজ ব্যবহার করে। আর এই গ্লুকোজকে শক্তিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজন হয় ইনসুলিন হরমোন। যখন শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন থাকে না, তখন কোষগুলো গ্লুকোজ গ্রহণ করতে পারে না। ফলে বিকল্প হিসেবে শরীর জমানো চর্বি বা ফ্যাট পোড়াতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় রক্তে ‘কিটোন’ নামক এক ধরনের অ্যাসিড তৈরি হয়। ইনসুলিনের অভাবে এই কিটোনগুলো ভাঙতে পারে না এবং রক্তে জমতে থাকে, যা এক পর্যায়ে শরীরকে বিষাক্ত করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ডায়াবেটিস রোগীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এই ডিকেএ। বিশেষ করে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়া বা ‘সেরিব্রাল এডিমা’র কারণে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ডিকেএ মূলত তিনটি সমস্যার সংমিশ্রণ: ১. রক্তে অতিরিক্ত শর্করা (Hyperglycemia) ২. রক্তে কিটোনের আধিক্য (Hyperketonemia) ৩. রক্তে অম্লের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া (Acidosis)।
ডিকেএ সাধারণত টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে যাদের বয়স ১৯ বছরের নিচে। ইনসুলিন নিতে ভুলে যাওয়া, হঠাৎ কোনো সংক্রমণ (Infection) বা বড় ধরনের শারীরিক আঘাত এর প্রধান কারণ হতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটি বিরল হলেও, দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকা বা গুরুতর অসুস্থতায় তারাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন।
শরীরে কিটোনের মাত্রা বেড়ে গেলে কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়, যা এড়িয়ে যাওয়া বিপদজনক:
অত্যধিক তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাব।
প্রবল ক্লান্তি ও ঝিমুনি ভাব।
১.বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
২.পেটে তীব্র ব্যথা।
৩.শ্বাস-প্রশ্বাসে ফলের মতো মিষ্টি গন্ধ (Fruity odor)।
৪.দ্রুত ও গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস।
৫.পেশিতে খিঁচুনি বা ব্যথা এবং শেষ পর্যায়ে রোগী কোমায় চলে যেতে পারেন।
চিকিৎসকরা সাধারণত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে ডিকেএ নিশ্চিত করেন। একজন সুস্থ মানুষের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৮০-১১০ mg/dl থাকলেও, ডিকেএ আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে তা ২৫০ mg/dl থেকে শুরু করে ৮০০ mg/dl পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া রক্তে বাইকার্বনেটের মাত্রা কমে যাওয়াও (১৫ mEq/L এর নিচে) এই রোগের বড় লক্ষণ। বর্তমানে বাজারে সহজলভ্য ‘টেস্ট স্ট্রিপ’ ব্যবহার করে রোগীরা ঘরে বসেই প্রস্রাবে কিটোনের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে পারেন।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। যদি উপরের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে এই রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা অঙ্গহানি বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

