দীর্ঘ আট বছরের কূটনৈতিক শীতলতা কাটিয়ে অবশেষে বেইজিংয়ের মাটিতে পা রাখলেন কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। কিয়ার স্টারমার ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই বৈঠক যেন দুই দেশের সম্পর্কের ক্যানভাসে এক নতুন রঙের ছোঁয়া। বৃহস্পতিবারের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে স্টারমার স্পষ্ট বার্তা দিলেন—অতীতের গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আর ভূ-রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ভুলে এবার তিনি চান এক “পরিপক্ক ও বাস্তবসম্মত” সম্পর্কের ভিত্তি গড়তে।
৮০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও ইতিহাসের পাঠ
টানা ৮০ মিনিট ধরে চলা এই বৈঠকে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ই হয়নি, বরং উঠে এসেছে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার কৌশলও। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অনেকটা দার্শনিক সুরেই বললেন, দুই দেশের উচিত ভেদাভেদ ভুলে দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টি দেওয়া, যাতে এই সম্পর্ক “ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষায়” উত্তীর্ণ হতে পারে।
শি জিনপিং তাঁর বক্তব্যে কৌশলে ব্রিটেনের বিগত কনজারভেটিভ সরকারের সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। তিনি মনে করিয়ে দেন, দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক “চড়াই-উতরাই” কারও জন্যই মঙ্গলজনক ছিল না। তবে অতীতে লেবার পার্টির সরকারগুলো যে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল, তার ভূয়সী প্রশংসাও করেন তিনি। সামনেই চীনা নববর্ষ, আর ঠিক এই মুহূর্তে স্টারমারের সফরকে শি এক “অত্যন্ত শুভলক্ষণ” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অবৈধ অভিবাসন রোধে বড় সমঝোতা
কথার ফুলঝুরির বাইরেও এই সফরে একটি বড় কাজের কাজ হয়েছে। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে অবৈধ প্রবেশ এখন ঋষি সুনাক থেকে স্টারমার—সবার জন্যই বড় মাথাব্যথা। এই সংকট মোকাবিলায় একজোট হলো লন্ডন ও বেইজিং। মানবপাচারকারীরা যেসব ছোট নৌকার (small boats) ইঞ্জিন ব্যবহার করে, সেগুলোর জোগান বন্ধে চীন এখন ব্রিটেনকে সহায়তা করবে। পাচারকারী চক্রের গোপন রুট শনাক্ত করতে দুই দেশের গোয়েন্দারা একে অপরের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করবেন—যা এই সফরের অন্যতম বড় সাফল্য।
ট্রাম্প-ভীতি ও বিশ্ব রাজনীতির দাবা
হঠাৎ কেন এই কাছাকাছি আসা? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছায়া দেখছেন। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার হুমকি এবং বাণিজ্যে শুল্ক আরোপের হুঙ্কার পশ্চিমা বিশ্বকে নতুন করে সমীকরণ মেলাতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতি চীনের ‘নীরব সমর্থন’ নিয়ে পশ্চিমাদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে বেইজিংও মরিয়া। চীনা রাষ্ট্রীয় মাধ্যমগুলো অবশ্য প্রচার করছে যে, আমেরিকার “আধিপত্যবাদী আচরণই” নাকি আমেরিকার মিত্রদের চীনের “স্থিতিশীলতার” দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঘরের ভেতর সমালোচনার ঝড়
বেইজিংয়ে যখন বন্ধুত্বের সুর, লন্ডনে তখন সমালোচনার ঝড়। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনক সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে বেইজিংয়ে পা-ও দিতেন না। লন্ডনে চীনের প্রস্তাবিত বিশাল নতুন দূতাবাসকে তিনি “গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া” বলে তোপ দেগেছেন।
সব বিতর্ক ছাপিয়ে স্টারমার এখন প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের অপেক্ষায়। এখন দেখার বিষয়, এই সফর কি সত্যিই দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাতে পারবে, নাকি এটি কেবলই বাণিজ্যের স্বার্থে সাময়িক করমর্দন।

