ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসা প্রথম রানী মেরি টিউডর। ইতিহাসে যার পরিচয় ‘ব্লাডি মেরি’ বা ‘রক্তপিপাসু মেরি’ হিসেবে। কিন্তু ইতিহাসের ধূসর পাতাগুলো উল্টালে দেখা যায়, তার এই নিষ্ঠুর পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক আজন্ম অবহেলিত কন্যা, এক একনিষ্ঠ বিশ্বাসী এবং এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া নারী। ১৫৫৩ থেকে ১৫৫৮—এই স্বল্পস্থায়ী শাসনকালে তিনি ইংল্যান্ডকে ক্যাথলিক ধর্মে ফিরিয়ে নিতে যে কঠোরতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা তাকে ইতিহাসে যেমন বিতর্কিত করেছে, তেমনি তার ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি তাকে দিয়েছে এক বিষণ্ণ মহিমা।
১৫১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মেরি। রাজা অষ্টম হেনরি এবং ক্যাথরিন অফ আরাগনের একমাত্র জীবিত সন্তান ছিলেন তিনি। শৈশবে তিনি ছিলেন বাবার চোখের মণি। হেনরি তখনো একজন একনিষ্ঠ ক্যাথলিক। কিন্তু পুত্রের আকাঙ্ক্ষা এবং অ্যান বোলিনের প্রতি আসক্তি মেরির জীবনকে বিষিয়ে তোলে। হেনরি যখন ক্যাথরিনকে ত্যাগ করে প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ অফ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন, তখন মেরি কেবল তার রাজকীয় পদবীই হারাননি, বরং তাকে ‘অবৈধ সন্তান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাবার অবজ্ঞা আর মায়ের বিচ্ছেদ মেরির মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘকাল তিনি বিচ্ছিন্ন জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু নিজের ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করেননি। ১৫৩৬ সালে মা ক্যাথরিনের মৃত্যুর পর অত্যন্ত চাপের মুখে তিনি বাবার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হন, যা তিনি গোপনে ‘বাধ্য হয়ে করা কাজ’ বলে নথিভুক্ত করেছিলেন।
১৫৫৩ সালে ভাই এডওয়ার্ডের মৃত্যুর পর লর্ড নর্থাম্বারল্যান্ডের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে মেরি যখন ক্ষমতায় বসেন, তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডকে পুনরায় রোমান ক্যাথলিক চার্চের অধীনে ফিরিয়ে আনা। তার এই বিশ্বাস ছিল অত্যন্ত দৃঢ়; তিনি মনে করতেন ঈশ্বর তাকে রক্ষা করেছেন কেবল এই ধর্মীয় সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য।
মহাসচিব কার্ডিনাল রেজিনাল্ড পোল ছিলেন তার প্রধান উপদেষ্টা। তার পরামর্শে মেরি একে একে তার বাবার এবং ভাইয়ের করা সমস্ত ধর্মীয় আইন বাতিল করেন। গির্জাগুলোর জৌলুস ফিরিয়ে আনা হয় এবং মঠগুলো পুনরায় সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মেরির শাসনামল সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয় তার ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে। ১৫৫৫ সাল থেকে ১৫৫৮ সালের মধ্যে প্রায় ২৮০ জন প্রোটেস্ট্যান্টকে ধর্মদ্রোহিতার অপরাধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এদের মধ্যে আর্চবিশপ থমাস ক্র্যানমার, বিশপ রিডলি এবং ল্যাটিমারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ছিলেন।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে:
★১৫৫৫-১৫৫৬: দমনপীড়নের শুরুতেই মেরির আদেশে প্রথম বছরেই প্রায় ৯০ জন প্রাণ হারান।
★১৫৫৭:এই বছর প্রায় ৭০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
★১৫৫৮: জীবনের শেষ এগারো মাসেও তিনি দমে যাননি, অন্তত ৪০ জন প্রোটেস্ট্যান্টকে আগুনের লেলিয়ান শিখায় প্রাণ দিতে হয়।
এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসই তাকে জনমানসে ‘ব্লাডি মেরি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
জন ফক্সের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অ্যাক্টস অ্যান্ড মনুমেন্টস’ (১৫৭০) মেরিকে একজন রক্তপিপাসু রানি হিসেবে চিত্রিত করে, যা থেকে তার নামের সাথে চিরতরে যুক্ত হয়ে যায় ‘ব্লাডি মেরি’ তকমা।
একজন শাসক হিসেবে মেরির ব্যর্থতাগুলো যতটা প্রচারিত, তার সাফল্যগুলো ঠিক ততটাই উপেক্ষিত। মেরি কেবল ধর্মের পেছনেই ছুটেননি, বরং ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কারে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল:
১. মুদ্রা সংস্কার: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনি ডিবেসড কারেন্সি বা নিম্নমানের মুদ্রার প্রচলন বন্ধ করে এর মান বৃদ্ধির চেষ্টা করেন।
২. বাণিজ্য ও দারিদ্র্য: ইংল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ কমানোর পাশাপাশি দরিদ্রদের কল্যাণে তিনি বেশ কিছু সামাজিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
৩. নৌবাহিনী: তার সময় নৌবাহিনীর কাঠামোগত যে উন্নয়ন হয়েছিল, তার সুফল ভোগ করেছিলেন পরবর্তী রানি প্রথম এলিজাবেথ।
বলা হয়ে থাকে, এলিজাবেথীয় যুগের যে অর্থনৈতিক ভিত্তি, তার অনেকটাই মেরির আমলে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার ধর্মীয় নির্যাতন এই সাফল্যগুলোকে ইতিহাসের আড়ালে পাঠিয়ে দিয়েছে।
মেরির ব্যক্তিগত জীবন ছিল বিষাদময়। ৩৮ বছর বয়সে তিনি স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপকে বিয়ে করেন। কিন্তু এই বিয়ে ছিল রাজনৈতিক ও একপাক্ষিক। ফিলিপ মেরিকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না। এমনকি মেরির দুটি ‘কাল্পনিক গর্ভধারণ’ (False Pregnancy) তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছিল।
১৫৫৮ সালের ১৭ নভেম্বর ৪২ বছর বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে (সম্ভবত ইনফ্লুয়েঞ্জা বা জরায়ুর ক্যানসার) মেরির মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর সাথে সাথেই ইংল্যান্ডে ক্যাথলিক শাসনের এক ক্ষুদ্র অথচ তীব্র অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং শুরু হয় এলিজাবেথীয় যুগের।
মেরি টিউডর কি সত্যিই নিষ্ঠুর ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন এক গোঁড়া ধার্মিক নারী যিনি তার বিশ্বাসকে রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন? সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের মতে, মেরির নিষ্ঠুরতা তার যুগের প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিক ছিল না, তবে প্রোটেস্ট্যান্ট বিজয়ীরা তার ইতিহাস লিখেছে বলে তিনি কেবল একজন ‘ভিলেন’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছেন। তবে ইতিহাসের নির্মোহ বিচারে তিনি এমন একজন রানি, যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে রাজদণ্ড হাতে নিয়েছিলেন এবং নিজের বিশ্বাসের জন্য সবকিছু বাজি রেখেছিলেন।
তথ্যসূত্রঃ
১. Prescott, H. F. M. (1953). Mary Tudor. New York: Macmillan.
২. Loades, D. M. (1989). Mary Tudor. New York: Blackwell.
৩. Elton, G. R. (1955). England under the Tudors. London: Methuen.
৪. Tittler, R. (1991). The Reign of Mary I. New York: Longman.
৫. Foxe, John. (1570). Acts and Monuments (Book of Martyrs).
৬. Harbison, E. H. (1940). Rival Ambassadors at the Court of Queen Mary. Princeton.
৭. Mackie, J. D. (1952). The Earlier Tudors. Oxford University Press

