আধুনিক বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি সত্ত্বেও হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার এবং দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধিগুলো আমাদের আয়ু কেড়ে নিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অকাল মৃত্যু এবং শারীরিক পঙ্গুত্বের প্রধান কারণ এখন আর সংক্রামক জীবাণু নয়, বরং আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলিত জীবনযাত্রা বা “সঞ্চিত ক্ষুদ্র ভুলসমূহ” (Accumulated indiscretions)। এই প্রেক্ষাপটে ‘প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য আচরণ’ বা Preventive Health Behavior হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
সমাজবিজ্ঞানী এস. ভি. কাসল এবং এস. কব স্বাস্থ্য আচরণকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য আচরণ’। এটি হলো এমন সব কাজ, যা একজন সুস্থ ব্যক্তি নিজেকে রোগমুক্ত রাখার জন্য বা লক্ষণহীন অবস্থায় কোনো রোগ শনাক্ত করার জন্য স্বেচ্ছায় করেন।
বিপরীতে, অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়াকে বলা হয় ‘ইলনেস বিহেভিয়ার’ এবং রোগী হিসেবে নিয়ম মেনে চলাকে বলা হয় ‘সিক-রোল বিহেভিয়ার’। বিশেষজ্ঞদের মতে, অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে দৌড়ানোর চেয়ে অসুস্থতা প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর এবং সাশ্রয়ী।
সাধারণত মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ করলে তার স্বাস্থ্যের উপকার হবে, তখনই সে সেই আচরণটি গ্রহণ করে। যেমন—ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান ত্যাগ করা। পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষদের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৭৯ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসারের কারণ হলো ধূমপান।
তবে সব প্রতিরোধমূলক আচরণই যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পন্ন, তা নয়। অনেক মানুষ মনে করেন প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি খেলে সাধারণ সর্দি-কাশি হবে না, যদিও এর কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। মূলত কোনো আচরণের কার্যকারিতা নির্ভর করে ওই আচরণ এবং রোগের কারণের (Etiology) মধ্যকার সম্পর্কের ওপর। যেমন—গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে, কিন্তু এটি জীবন বাঁচানোর শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না; এটি কেবল ঝুঁকি হ্রাস করে।
স্বাস্থ্য আচরণকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. প্রাথমিক প্রতিরোধ (Primary Prevention):রোগ হওয়ার আগেই তা ঠেকানো। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং তামাক বর্জন এর অন্তর্ভুক্ত। এটি শরীরে উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল জমতে বাধা দেয়।
২. দ্রুত শনাক্তকরণ (Secondary Prevention):রোগ শরীরে বাসা বাঁধলেও লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই তা ধরে ফেলা। যেমন—নারীদের ক্ষেত্রে ম্যামোগ্রাম বা প্যাপ টেস্ট। এর মাধ্যমে ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা সম্ভব হয়।
স্বাস্থ্য আচরণ কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ এখানে বড় ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে রান্নায় অলিভ অয়েল বা জলপাই তেলের ব্যবহার তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। এটি তাদের সংস্কৃতির অংশ, কেবল স্বাস্থ্যের কথা ভেবে নয়।
আবার লিঙ্গভেদেও এই আচরণ পরিবর্তিত হয়। এক সময় নারীদের ধূমপান করা সামাজিকভাবে ট্যাবুর মতো ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই সামাজিক বাধা দূর হওয়ায় নারীদের মধ্যে ফুসফুসের রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ১৯৯৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পুরুষদের মধ্যে ধূমপানজনিত মৃত্যুহার কমলেও নারীদের মধ্যে তা প্রায় ৬২ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাস্থ্য আচরণ বুঝতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তাত্ত্বিক মডেল ব্যবহার করেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘হেলথ বিলিফ মডেল’ এবং ‘সোশ্যাল কগনিটিভ থিওরি’। এই তত্ত্বগুলো বলে যে, একজন মানুষ তখনই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলে যখন সে মনে করে যে তার রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি এবং অভ্যাস পরিবর্তনের সুবিধা অনেক। তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় মানুষকে স্বাস্থ্যকর পথ বেছে নিতে বাধা দেয়।
বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে দেখা গেছে, সিটবেল্ট ব্যবহারের হার বা ম্যামোগ্রাম করানোর প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও খাদ্যাভ্যাস এবং স্থূলতার (Obesity) ক্ষেত্রে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। মানুষ এখনো জাঙ্ক ফুডের চেয়ে টাটকা শাকসবজি গ্রহণে পিছিয়ে আছে। আবার ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের হারও বাড়েনি আশানুরূপ। তামাক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লেও অনেক দেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে।
সুস্থভাবে বেঁচে থাকার চাবিকাঠি আমাদের হাতেই। সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত অ্যালকোহল গ্রহণ এবং তামাক বর্জন—এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই পারে দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে আমাদের রক্ষা করতে। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় নয়; এটি জৈবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ফ্যাক্টরগুলোর এক জটিল সংমিশ্রণ। একটি সুস্থ জাতি গঠনে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনও অপরিহার্য।
তথ্যসূত্রঃ
★Kasl, S. V., & Cobb, S. (1966). Health Behavior, Illness Behavior, and Sick Role Behavior.*)Archives of Environmental Health.
★Westberg, J., & Jason, H. (1996).Influencing Health Behavior. Health Promotion and Disease Prevention in Clinical Practice.
★Centers for Disease Control and Prevention (CDC) Reports.
★Office on Smoking and Health (1989).Surgeon General’s Report on Smoking.
★Glanz, K., Lewis, F., & Rimer, B. (1997).Health Behavior and Health Education.

