Wednesday, July 29, 2026
32.2 C
Bangladesh

ফলের রাজা না কি গন্ধের নরক? বিচিত্র ফল ‘দুরিয়ান’-এর আদ্যোপান্ত

প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি দুরিয়ান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই ফলটিকে বলা হয় ‘ফলের রাজা’। কিন্তু এই রাজার মুকুটে যেমন স্বাদের প্রশংসা আছে, তেমনি আছে গন্ধের কলঙ্ক। কারো কাছে এটি অমৃত, আবার কারো কাছে এটি নাসিকার জন্য চরম যন্ত্রণা। কাঁটাযুক্ত শক্ত খোলস আর ভেতরে মাখনের মতো নরম কোষ—সব মিলিয়ে দুরিয়ান এক রহস্যময় ফল।

১৮১৯ সালে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা স্যার স্ট্যামফোর্ড র‍্যাফেলস বলেছিলেন, এই ফলের গন্ধ পেলে তিনি নাক চেপে উল্টো দিকে দৌড় দিতেন। আবার উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি প্রকৃতিবিদ অঁরি মুহু যখন প্রথম এটি চেখে দেখেন, তখন তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “মনে হচ্ছে পচে যাওয়া কোনো পশুর মাংস খাচ্ছি।”

কিন্তু কেন এই ফল নিয়ে এত উন্মাদনা? কারণ এর স্বাদ। যারা এর গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে যান, তাদের কাছে এটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খাবার। কেউ এর স্বাদকে তুলনা করেন ‘বুনো মধু আর পোড়া ওকের’ সাথে, কেউবা বলেন এটি ‘বিটারসুইট বাটারস্কচ’ বা ‘ক্রিম ব্রুলি’র মতো। থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় ‘মাউং থং’ বা গোল্ডেন পিলো জাতের দুরিয়ান অনেকটা বাদাম ও আলমনডের স্বাদের মিশ্রণ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দুরিয়ান শুধু একটি ফল নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে কিছু দূরে অবস্থিত ননথাবুরি প্রদেশে প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে দুরিয়ান ভক্তদের ঢল নামে। সেখানে নদীর তীরে যখন এই বিশাল আকৃতির ফলগুলো কাটা হয়, তখন চারপাশ এক তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে ওঠে।

চীনা সংস্কৃতিতে দুরিয়ানকে কামোদ্দীপক (Aphrodisiac) হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০০ সালে হংকংয়ের পরিচালক ফ্রুট চ্যান ‘দুরিয়ান দুরিয়ান’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেখানে তিনি এই ফলের রূপক ব্যবহার করে সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রাম দেখিয়েছেন। মালয়দের একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে— “যখন দুরিয়ান গাছ থেকে পড়ে, তখন সারং (পরনের কাপড়) খুলে পড়ে”, যা এর আকর্ষণীয় শক্তির ইঙ্গিত দেয়।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম Durio zibethus। এটি বোম্বাকাসি (Bombacaceae) পরিবারের সদস্য, যা অনেকটা আমেরিকার এলম গাছের মতো বিশাল হয় (উচ্চতায় প্রায় ১২০ ফুট)। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ ১০ বছর বয়স থেকে বছরে প্রায় ২০০টি ফল দিতে পারে। একেকটি ফলের ওজন আট পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, পাকা ফলগুলো গাছ থেকে সরাসরি নিচে পড়ে। তাই ফসল কাটার মৌসুমে এই গাছের নিচ দিয়ে হাঁটা প্রাণঘাতী হতে পারে।

বন্যপ্রাণীদের কাছেও এটি অত্যন্ত প্রিয়। থাইল্যান্ডে প্রচলিত আছে যে, হাতিরা প্রথমে এর গন্ধ পায় এবং গাছ ঝাঁকিয়ে ফল নিচে ফেলে। এরপর বাঘ, গণ্ডার, বন্যশুকর এবং বানরেরা এই ফলের ভাগ নিতে লড়াই শুরু করে। মানুষের জন্য অবশিষ্ট ফলটুকু পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

দুরিয়ান কেনা একটি আর্ট বা শিল্প। পাকা ফল চেনার উপায় এর গন্ধ নয়, বরং এর শব্দ। অভিজ্ঞ ক্রেতারা একটি সেগুন কাঠের কাঠি দিয়ে ফলের ওপর টোকা দেন। যদি শব্দটা নিরেট বা ‘থাদ’ (Thud) হয়, তার মানে এটি এখনো কাঁচা। যদি শব্দটা খুব ফাঁপা হয়, তবে বুঝবেন এটি অতিরিক্ত পেকে নরম হয়ে গেছে। আদর্শ দুরিয়ান চেনার উপায় হলো এর মাঝামাঝি একটি প্রতিধ্বনি।

বিমানে বা পাবলিক পরিবহনে এই ফল বহন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ এর তীব্র গন্ধ লাগেজের দেয়াল ভেদ করে যাত্রীদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারে। তাসত্ত্বেও এর বিশ্ববাজার বিশাল। ২০০০ সালেই ক্যানবন্দি দুরিয়ান রপ্তানি করে ৩০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল।

দুরিয়ান যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিকর। প্রতি ১০০ গ্রাম দুরিয়ানে থাকে:

★ক্যালরি: ১৫৩

★কার্বোহাইড্রেট: ২৭.৯ গ্রাম

★প্রোটিন: ২.৬ গ্রাম

★ভিটামিন সি: ২৩.২ মিলিগ্রাম

★পটাশিয়াম ও মিনারেলস: ১০৩.৯ মিলিগ্রাম

বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার ভিন্ন। বোর্নিওতে কাঁচা দুরিয়ান নুন দিয়ে সেদ্ধ করে চাটনি হিসেবে খাওয়া হয়। মালয়েশিয়ায় এর বীজগুলো পপকর্ন বা বাদামের মতো ভেজে খাওয়া হয়। শ্রীলঙ্কায় মহিষের দই ও চিনির সাথে এর পাল্প মিশিয়ে ডেজার্ট তৈরি করা হয়। এছাড়া বর্তমানে দুরিয়ান আইসক্রিম, জ্যাম এবং ক্যান্ডিও বেশ জনপ্রিয়।

একটি প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে, অ্যালকোহল বা মদের সাথে দুরিয়ান খাওয়া উচিত নয়। ধারণা করা হয়, পেটের ভেতর এই ফল ও অ্যালকোহলের ফারমেন্টেশন বা গাজন প্রক্রিয়া প্রাণঘাতী হতে পারে। যদিও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে এশিয়ায় এটি কঠোরভাবে মেনে চলা হয়।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...