ঢাকার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা হলো। রাজধানীর সাতটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজকে একটি সমন্বিত ও স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর অধীনে এনে গঠিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ (ডিসিইউ)-এর চূড়ান্ত অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এই গেজেট প্রকাশ করে।
এর আগে গত ২২ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ এই অধ্যাদেশের চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন দিয়েছিল। রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশে জারিকৃত এই অধ্যাদেশটি সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজধানীর সাত কলেজের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও সেশনজট নিরসনের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো।
একটি নতুন প্রশাসনিক মডেলের অভ্যুদয়
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে এবং আধুনিক স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংমিশ্রণে একটি স্বতন্ত্র মডেলে পরিচালিত হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলো হলো: ১. ঢাকা কলেজ ২. ইডেন মহিলা কলেজ ৩. সরকারি তিতুমীর কলেজ ৪. সরকারি সরকারি বাংলা কলেজ ৫. বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ৬. সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ৭. কবি নজরুল সরকারি কলেজ
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এই কলেজগুলো তাদের নিজস্ব নাম, ঐতিহ্য, অবকাঠামো এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা অপরিবর্তিত রাখবে। তবে তাদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এখন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে সরাসরি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
ডিসিইউ একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে থাকছেন আচার্য (রাষ্ট্রপতি)। এছাড়া একটি শক্তিশালী সিনেট, সিন্ডিকেট এবং একাডেমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালিত হবে। সিন্ডিকেট হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী কর্তৃপক্ষ এবং একাডেমিক কাউন্সিল শিক্ষার মান ও পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় তত্ত্বাবধান করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) নিয়মিতভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করবে।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধীনে কলা, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন এবং চারুকলা অনুষদ বা স্কুল থাকবে। প্রতিটি স্কুলের অধীনে আলাদা প্রধান বা হেড অব স্কুল থাকবেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম, পরীক্ষা এবং ফলাফল মূল্যায়ন একটি অভিন্ন কেন্দ্রীয় সময়সূচি বা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের সেশনজট থেকে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়নের মাধ্যমে সাতটি কলেজের শিক্ষার মানে সমতা আনা হবে। এছাড়া এমফিল এবং পিএইচডি প্রোগ্রামগুলো কলেজগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হবে, যা এই কলেজগুলোর শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ আরও বাড়িয়ে দেবে।
নতুন এই ব্যবস্থায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে এসএসসি ও এইচএসসি ফলাফলের পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা ও মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবেন।
স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্বপ্ন ও বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমানে ডিসিইউ-এর নিজস্ব কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নেই। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকার অতি দ্রুত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু করবে। তবে স্থায়ী ভবন হওয়ার আগ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ভাড়া করা ভবন বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে অস্থায়ীভাবে চলবে। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস বা কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।
ডিসিইউ-এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের ২৬ মার্চ ইউজিসি এই সাত কলেজকে নিয়ে একটি আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের সুপারিশ করেছিল। পরবর্তীতে ১২ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এই কলেজগুলোর দীর্ঘদিনের অধিভুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন এবং রাজধানীর উচ্চশিক্ষার চাপ সামলাতেই এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
শিক্ষাবিদদের মতে, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। যদি সঠিক তদারকি ও সদিচ্ছা থাকে, তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অচিরেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে পরিণত হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা খালিদ মাহমুদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “এই অধ্যাদেশ কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একটি অঙ্গীকার।”

