আধুনিক সমাজে ‘সুস্থতা’ বলতে আমরা সাধারণত শারীরিক নিরোগ অবস্থাকেই বুঝি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিবর্তনের সাথে সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের সংজ্ঞায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। গত কয়েক দশক ধরে মনোবিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, মানসিক রোগ না থাকলেই একজনকে ‘মানসিকভাবে সুস্থ’ বলা যায় না। ১৯৫৮ সালে মারি জাহোদা (Marie Jahoda) যখন ‘পজিটিভ মেন্টাল হেলথ’ বা ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যের ধারণা প্রবর্তন করেন, তখন থেকেই এই বিতর্কের মোড় ঘুরে যায়। তার মতে, ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্য কোনো সাময়িক অবস্থা নয়, বরং এটি ব্যক্তিত্বের এক স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।
মারি জাহোদা তার ক্ল্যাসিক গ্রন্থ ‘Current Concepts of Positive Mental Health’ এ ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যের ছয়টি প্রধান সূচক চিহ্নিত করেছেন। এই সূচকগুলো একজন ব্যক্তিকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল এবং সফল হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
১. নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি (Attitude toward own self): একজন মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। তিনি নিজের ইতিবাচক দিকগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে জীবন পরিচালনা করেন।
২. বিকাশ এবং আত্ম-উপলব্ধি (Growth, Development, and Self-actualization): আব্রাহাম মাসলোর (১৯৫৪) তত্ত্বের সাথে তাল মিলিয়ে জাহোদা জানান, নিজের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়াই হলো সুস্থতার লক্ষণ। এটি কেবল নিজের প্রয়োজন মেটানো নয়, বরং সমাজ ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরির একটি প্রক্রিয়া।
৩. সমন্বয় বা ইন্টিগ্রেশন (Integration): মানসিক চাপের মুখেও নিজেকে ভেঙে পড়তে না দেওয়া এবং জীবন দর্শনে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা হলো ইন্টিগ্রেশন। এটি ইড, ইগো এবং সুপার-ইগোর মধ্যকার একটি সুস্থ ভারসাম্য।
৪. স্বায়ত্তশাসন (Autonomy): একজন সুস্থ মানুষ তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন। তিনি বাইরের পরিবেশ বা সমাজের চাপে নিজের স্বকীয়তা হারান না, বরং নিজস্ব বিচারবুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন।
৫. বাস্তবতার সঠিক উপলব্ধি (Perception of Reality): জাহোদার মতে, যখন একজন ব্যক্তি জগতকে তার প্রকৃত রূপেই দেখতে পান, কোনো কল্পনা বা ব্যক্তিগত ইচ্ছার রঙ না মিশিয়ে, তখনই তিনি মানসিকভাবে সুস্থ।
৬. পরিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ (Environmental Mastery): সামাজিক ভূমিকা পালন, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা এবং আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা এই সূচকের মূল লক্ষ্য।
মারি জাহোদা যেখানে বাস্তবতার সঠিক উপলব্ধিকে সুস্থতার চাবিকাঠি বলেছেন, সেখানে ১৯৮৮ সালে টেলর এবং ব্রাউন এক বৈপ্লবিক তথ্য সামনে আনেন। তাদের মতে, সামান্য ‘অবাস্তব ইতিবাচকতা’ বা এক ধরণের মোহ (Illusion) আসলে মানুষের মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন গড়পড়তা সুস্থ মানুষ নিজের সম্পর্কে একটু বেশিই ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তারা নিজেদের দুর্বলতার চেয়ে শক্তির দিকগুলো বেশি দেখেন। মজার ব্যাপার হলো, টেলর এবং ব্রাউনের গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক বেশি ‘বাস্তববাদী’ হন। অন্যদিকে, সুস্থ মানুষেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পর্কে কিছুটা বাড়িয়ে ভাবেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকেন। এই ‘পজিটিভ ইলুশন’ বা ইতিবাচক মোহ মানুষকে কঠিন সময়ে টিকে থাকার শক্তি যোগায় এবং সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করে।
১৯৮৮ সালে জেনসেন এবং বার্গিন ৪২৫ জন পেশাদার থেরাপিস্টের (যাদের মধ্যে মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন) ওপর একটি দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনা করেন। এই গবেষণায় উঠে আসে যে, মানসিক সুস্থতার জন্য আটটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
★আবেগ প্রকাশ:অনুভূতির সঠিক বহিঃপ্রকাশ এবং সততা।
★দায়িত্ববোধ:নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকা।
★কর্মতৃপ্তি:কাজের মাধ্যমে আত্মতুষ্টি অর্জন।
★পারিবারিক প্রতিশ্রুতি:বৈবাহিক বিশ্বস্ততা এবং পরিবারের প্রতি ত্যাগ।
★শারীরিক সুস্থতা:ব্যায়াম এবং মাদকদ্রব্য থেকে দূরে থাকা।
জরিপে অংশগ্রহণকারী থেরাপিস্টদের একটি বিশাল অংশ (উচ্চ পর্যায়ের কনসেনসাস) এই মূল্যবোধগুলোর সাথে একমত পোষণ করেছেন, যা জাহোদার তত্ত্বকেই আধুনিক রূপ প্রদান করে।
মানসিক স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা সব সময় এক থাকে না। এটি সমাজ, সংস্কৃতি এবং লিঙ্গভেদে পরিবর্তিত হয়। ব্রোভারম্যান এবং তার সহযোগীরা (১৯৮১),৭৯ জন থেরাপিস্টের ওপর একটি গবেষণা চালিয়ে দেখেন যে, নারী ও পুরুষের মানসিক সুস্থতার মানদণ্ড সমাজ ভিন্নভাবে দেখে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ পুরুষের বৈশিষ্ট্য হিসেবে যেখানে ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব’কে দেখা হয়, সেখানে সুস্থ নারীর ক্ষেত্রে ‘নম্রতা’ বা ‘কম আগ্রাসী’ হওয়ার মতো বৈশিষ্ট্যগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই লিঙ্গ বৈষম্য প্রমাণ করে যে, মানসিক স্বাস্থ্যের ধারণাটি অনেক সময় সামাজিক রীতিনীতির ওপর নির্ভরশীল।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ‘নরমালিটি’ বা স্বাভাবিকতা মানে কেবল রোগের অনুপস্থিতি। কিন্তু ‘পজিটিভ মেন্টাল হেলথ’ হলো মানুষের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ। জাহোদার (১৯৮৮) মতে, নিম্নস্তরের মানসিক স্বাস্থ্য মানেই মানসিক অসুস্থতা নয়। যেমন, একজন মানুষের কোনো রোগ না থাকলেও তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকতে পারে, যা তাকে ‘পজিটিভ মেন্টাল হেলথ’ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
পরিশেষে বলা যায়, ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্য হলো একটি চলমান লক্ষ্য। এটি কোনো গন্তব্য নয়, বরং একটি যাত্রা। জীবনের প্রতিকূলতার মাঝেও নিজেকে খুঁজে পাওয়া, নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতাই হলো প্রকৃত সুস্থতা। এটি একটি ইউটোপিয়ান বা আদর্শবাদী ধারণা হতে পারে, কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টাই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলে।
তথ্যসূত্রঃ
১.জাহোদা, এম. (১৯৫৮). Current Concepts of Positive Mental Health.নিউ ইয়র্ক: বেসিক বুকস।
২. টেলর, এস. এবং ব্রাউন, জে. (১৯৮৮). Illusion and Well Being: A Social Psychological Perspective on Mental Health. সাইকোলজিক্যাল বুলেটিন।
৩. জেনসেন, জে. পি. এবং বার্গিন, এ. ই. (১৯৮৮). Mental Health Values of Professional Therapists. প্রফেশনাল সাইকোলজি।
৪. ব্রোভারম্যান, আই. কে. ও অন্যান্য (১৯৮১). Sex-Role Stereotypes and Clinical Judgments of Mental Health.
৫. মাসলো, এ. এইচ. (১৯৫৪). Motivation and Personality. নিউ ইয়র্ক: হার্পার অ্যান্ড রো।
৬. আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (১৯৯৪).Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders (DSM-IV).

