দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এবং বাংলাদেশের হৃদপিণ্ড ঢাকা এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। একদিকে আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর মেগা প্রকল্পের ঝকঝকে রূপ, অন্যদিকে বসবাসের ন্যূনতম মানদণ্ড নিয়ে তীব্র বিতর্ক। সব মিলিয়ে ঢাকার বর্তমান রূপটি যেন এক বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি।
ঢাকার জীবনযাত্রার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘস্থায়ী যানজট। গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে প্রতিদিন এই শহরের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ। প্রতিবছর শীতকাল আসতে না আসতেই ঢাকা বিশ্বের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষে চলে আসে। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া নগরবাসীকে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়াও ঢাকার পানি, বাতাস ও শব্দদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পরিবেশের অস্বাভাবিক দূষণে বাড়ছে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ।
ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এর ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় তিন ধাপ পিছিয়ে ১৭১ তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। ঢাকার আগে রয়েছে শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপলি।

এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন। উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাতায়াত এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি নগরবাসীর জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নামক উড়ালপথ। ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে পরিকল্পিত নগরায়নের অংশ হিসেবে গড়ে উঠছে পূর্বাচল এলাকা।
শহরের অপর্যাপ্ত পার্ক এবং খোলা জায়গার অভাব তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কংক্রিটের জঙ্গলে শিশুদের শৈশব আজ চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। তবে হাতিরঝিলের মতো কিছু এলাকা নগরবাসীকে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিচ্ছে। যদিও রাতের অন্ধকার যতো ঘনিয়ে আসে সেখানে ততোই তীব্র হয়ে ওঠে নানা প্রকার অপরাধপ্রবণতা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে শুধু বড় বড় দালান নির্মাণ করলেই হবে না, বরং বিকেন্দ্রীকরণে জোর দিতে হবে। ঢাকার ওপর মানুষের চাপ কমাতে ঢাকার বাইরের শহরগুলোকে সুযোগ-সুবিধায় উন্নত করা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকা আমাদের আবেগের শহর, স্বপ্ন পূরণের শহর। কিন্তু এই শহরকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করতে হলে প্রশাসনিক কঠোরতা, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং নাগরিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

