পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রকল্পের ছোঁয়ায় দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দৃশ্যমান আধুনিকতা এলেও, সড়কের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা এখনো এক গোলকধাঁধায় আটকে আছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশের সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার হার ও যানজটের তীব্রতা জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতেই সারাদেশে ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪৮৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। প্রতিবারের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। মোট নিহতের প্রায় ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতি এবং হেলমেট ব্যবহারের উদাসীনতাই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ।
গত কয়েক দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তীব্র যানজট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর ও এশিয়ান হাইওয়ে অংশে ভাঙা রাস্তা এবং অতিরিক্ত পণ্যবাহী ট্রাকের চাপে স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থেকে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে পরিবহন খরচ। বাসচালকদের মতে, কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে রাস্তার বেহাল দশা এবং ধীরগতির থ্রি-হুইলারের অবাধ বিচরণ এই জটের মূলে কাজ করছে।
সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বর্তমান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক জরুরি সভায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন:
* প্রধান সড়কে অটোরিকশা নিষেধ: ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এছাড়াও মেট্রোরেলে সম্প্রসারণে মেট্রোরেলের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে যাতে নগরবাসীর চাপ কমানো যায়।’ র্যাপিড পাস’ কার্ডের অনলাইন রিচার্জ সুবিধা এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে যাতায়াত ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সড়ক বিশেষজ্ঞরা সড়ক ব্যবস্থাপনার এই নাজুক অবস্থার পেছনে কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করছেন। ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও অবকাঠামো: অনেক স্থানে রাস্তার বাঁক ও নকশায় ত্রুটি থাকায় দুর্ঘটনাকবলিত ‘ব্ল্যাক স্পট’ তৈরি হচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন চালক ও আনফিট গাড়ি: সড়কে এখনো বিপুল পরিমাণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আইনের প্রয়োগে শিথিলতা: সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া এবং তদারকির অভাবে বিশৃঙ্খলা কাটছে না।
সরকার বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট’ পরিচালনা করছে, যার আওতায় ৬০ হাজার চালককে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, শুধু প্রশিক্ষণ বা রাস্তা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় ট্রাফিক পুলিশের কঠোর অবস্থান এবং সাধারণ পথচারীদের সচেতনতা সমানভাবে জরুরি।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের একজন প্রতিনিধি। বলেন, সড়ক উন্নয়ন মানে শুধু পিচ ঢালাই নয়, নিরাপদ ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা।”

