বিশ্ব শান্তির এক নতুন রূপরেখা নিয়ে ওয়াশিংটনে শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত “বোর্ড অব পিস” (Board of Peace) শীর্ষ সম্মেলন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনেই গাজা পুনর্নির্মাণ এবং মানবিক সহায়তার জন্য ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলারের বিশাল এক তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।
বোর্ড অব পিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাইডলাইনে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটিকে জাতিসংঘের একটি ‘চটপটে’ এবং ‘কার্যকর’ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেন। মূলত ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে গাজায় শান্তি ফেরানোর যে ম্যান্ডেট দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে ভিত্তি করেই এই বোর্ড গঠন করা হয়। তবে এর পরিধি এখন কেবল গাজাতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংঘাত নিরসন সংস্থায় রূপ নিচ্ছে।
উদ্বোধনী ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন,
“এই বোর্ড কয়েক দশকের রক্তপাত বন্ধ করে একটি সুন্দর এবং চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে। আজ আমরা গাজার মানুষের জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছি, যা দিয়ে এই বিধ্বস্ত জনপদকে একটি আধুনিক এবং সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করা হবে।”
এই তহবিলের একটি বড় অংশ আসবে আরব দেশগুলো এবং এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো থেকে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্ক এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল গাজার নিরাপত্তা। বোর্ড অব পিস একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ (ISF) গঠনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।
এই বাহিনীর নেতৃত্বে থাকবেন একজন মার্কিন জেনারেল।
উদ্দেশ্য:গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং একটি নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
গাজা শাসনের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন ‘ন্যাশনাল কমিটি’ (NCAG) গঠিত হবে, যা সরাসরি এই বোর্ডের অধীনে কাজ করবে।
বোর্ড অব পিস নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যেমন আশা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীব্র সমালোচনা ও আইনি প্রশ্ন। সংস্থার খসড়া সনদ (Charter) অনুযায়ী:
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বোর্ডের আজীবন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, এমনকি তার প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হলেও।
নতুন কোনো দেশকে স্থায়ী সদস্য হতে হলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি (বলা হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি ডলার) এবং চেয়ারম্যানের সরাসরি অনুমোদন প্রয়োজন।
চেয়ারম্যানের কাছে যেকোনো সিদ্ধান্ত ভেটো দেওয়ার বা সদস্যপদ বাতিল করার একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখা হয়েছে।
এই উদ্যোগ বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে।
হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, আর্জেন্টিনার হাভিয়ের মিলেই এবং ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে এবং ট্রাম্পের এই ‘ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কূটনীতি’ বাস্তব ফল বয়ে আনবে।
অন্যদিকে জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো এই সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মতে, এটি জাতিসংঘের কর্তৃত্বকে ধ্বংস করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা। তাদের আশঙ্কা, এই বোর্ড মূলত ট্রাম্পের একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক ক্লাব হিসেবে কাজ করবে।
এই প্রতিবেদনের তথ্যগুলো নিম্নলিখিত বিশ্বস্ত সূত্র ও নথিপত্র থেকে সংগৃহীত:
UN Security Council Resolution 2803 (Nov 2025): যা গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ২০-দফা পরিকল্পনার আইনি ভিত্তি দেয়।
White House Press Briefing (Feb 18, 2026): যেখানে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ৫০০ কোটি ডলারের তহবিলের কথা নিশ্চিত করেন।
World Economic Forum Archive (Jan 2026): দাভোসে বোর্ড অব পিস সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর তালিকা (যাতে সৌদি আরব, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের নাম রয়েছে)।
The Munich Security Report 2026: যেখানে বোর্ড অব পিসকে বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বোর্ড অব পিস শেষ পর্যন্ত বিশ্ব শান্তির দূত হবে নাকি মার্কিন প্রভাব বিস্তারের নতুন হাতিয়ার—তা নিয়ে বিতর্ক চলবেই। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আমরা দেখে অভ্যস্ত ছিলাম, তা এখন এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই সম্মেলন কেবল গাজার ভাগ্য নয়, বরং আগামী দশকের বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণও নির্ধারণ করে দিতে পারে।

