আজ উনিশে ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতি বার ‘প্রতিরোধ প্লেজিয়ারিজম দিবস’ বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্য এখন হাতের নাগালে। ইন্টারনেটের কল্যাণে যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান আহরণ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি অন্যের সৃজনশীল কাজ নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বা ‘প্লেজিয়ারিজম’ (Plagiarism) মহামারি আকার ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্যের মেধা ও শ্রমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং লেখায় সততা বজায় রাখার অঙ্গীকার নিয়ে পালিত হচ্ছে ‘প্রতিরোধ প্লেজিয়ারিজম দিবস’। প্রতি বছর এই দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি শব্দ বা একটি ধারণা—যাই হোক না কেন, তা যদি অন্যের হয়, তবে তাকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া কেবল শিষ্টাচার নয়, বরং একটি নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
প্লেজিয়ারিজম বা মেধা-চুরি বলতে সাধারণত অন্যের লেখা, ধারণা বা গবেষণালব্ধ ফলাফল নিজের বলে চালিয়ে দেওয়াকে বোঝায়। এটি কেবল কপি-পেস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় দেখা যায়, মূল লেখকের বাক্যের গঠন ঠিক রেখে কেবল দু-একটি শব্দ বদলে দেওয়া হয়, যাকে গবেষকরা ‘প্যাচরাইটিং’ (Patchwriting) বলে অভিহিত করেন। আবার নিজের পূর্বের কোনো কাজ নতুন করে কোথাও জমা দেওয়াকেও ‘সেলফ-প্লেজিয়ারিজম’ বলা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই লেখকরা এড়িয়ে যান বা গুরুত্ব দেন না।
ইতিহাসের পাতা থেকে: ‘কবিতা অপহরণ’
মজার ব্যাপার হলো, ‘প্লেজিয়ারিজম’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে লাতিন শব্দ ‘Plagiarius’ থেকে, যার অর্থ হলো ‘অপহরণকারী’। প্রথম শতাব্দীতে রোমান কবি মার্শাল তার কবিতা চুরির দায়ে অন্য এক কবিকে ‘অপহরণকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছিলেন। সেই থেকে সাহিত্যের এই চৌর্যবৃত্তি মেধা-অপহরণ হিসেবেই পরিচিত। ১৭১০ সালে ব্রিটেনের ‘স্ট্যাটিউট অফ অ্যান’ (Statute of Anne) আইনের মাধ্যমে লেখকদের মেধা-স্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া শুরু হয়, যা আধুনিক কপিরাইট আইনের ভিত্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে একাডেমিক ও পেশাদার ক্ষেত্রে অত্যধিক কাজের চাপ এবং দ্রুত ফলাফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে চুরির পথে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে প্লেজিয়ারিজমের হার প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বুঝতেই পারে না যে, ইন্টারনেট থেকে পাওয়া তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। যথাযথভাবে উদ্ধৃতি (Citation) দেওয়ার নিয়ম না জানার কারণেও অনেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্লেজিয়ারিজমের শিকার হন।
প্লেজিয়ারিজম কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট তৈরি করে। একজন শিক্ষক যখন তার ছাত্রের ওপর বিশ্বাস হারান, কিংবা একজন পাঠক যখন জানতে পারেন তার প্রিয় লেখকের লেখাটি অন্য কারও থেকে চুরি করা, তখন সৃজনশীলতার ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। যখন আমরা অন্যের কাজকে যথাযথ স্বীকৃতি দেই, তখন সেটি কেবল তাকে সম্মান জানানো হয় না, বরং আমাদের নিজেদের কাজের গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি করে। এটি প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীর গবেষণা করেছি।
প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধের সেরা উপায় হলো শিক্ষা ও সচেতনতা। আজকের এই বিশেষ দিনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরে নিম্নোক্ত কার্যক্রমগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
সৃজনশীল কর্মশালা: শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক রেফারেন্সিং এবং প্যারাফ্রেজিং (নিজের ভাষায় লেখা) নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা।
স্মার্ট নোট-টেকিং: গবেষণা করার সময় কোন অংশটি মূল লেখকের এবং কোন অংশটি নিজের মন্তব্য, তা শুরু থেকেই আলাদা করে চিহ্নিত করা।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: ‘টার্নিটিন’ (Turnitin) বা এই ধরণের সফটওয়্যার ব্যবহার করে নিজের লেখার মৌলিকতা যাচাই করে নেওয়া। তবে মনে রাখতে হবে, সফটওয়্যার কেবল মিল খুঁজে পায়, নৈতিকতা বিচার করার দায়িত্ব মানুষেরই।
স্বীকৃতির সংস্কৃতি: যেকোনো ছোট অবদানের জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস গড়ে তোলা।
মৌলিকতা কোনো শৌখিনতা নয়, এটি সৃজনশীলতার মূল শক্তি। ‘প্রতিরোধ প্লেজিয়ারিজম দিবস’ আমাদের শেখায় যে, অন্য একজনের গবেষণার প্রতিটি পরিসংখ্যান, কবির প্রতিটি উপমা কিংবা ডিজাইনারের প্রতিটি রেখা তার কঠোর পরিশ্রমের ফল। সেই শ্রমকে অস্বীকার করা মানে নিজের সৃজনশীল সত্তাকেই ছোট করা। আসুন, আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা যা লিখব, তা হবে আমাদের নিজেদের চিন্তার প্রতিফলন, আর যেখানে অন্যের সাহায্য নেব, সেখানে গর্বের সাথে তার নাম উল্লেখ করব। তবেই গড়ে উঠবে একটি স্বচ্ছ ও সৃজনশীল সমাজ।
তথ্যসূত্রঃ
১. Jonson, B. (1621). ইংরেজি সাহিত্যে ‘Plagiary’ শব্দের প্রথম ব্যবহারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
২. Statute of Anne (1710). ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত প্রথম আধুনিক কপিরাইট আইন।
৩. International Center for Academic Integrity (ICAI). (২০০২, ২০০৭). একাডেমিক সততার মৌলিক মূল্যবোধ এবং ‘প্রতিরোধ প্লেজিয়ারিজম দিবস’ প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট।
৪. McCabe, D. (2000s). বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্লেজিয়ারিজমের প্রবণতা বিষয়ক দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রতিবেদন।
৫. Committee on Publication Ethics (COPE). পেশাদার প্রকাশনা এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘সেলফ-প্লেজিয়ারিজম’ সংক্রান্ত নীতিমালা।
৬. Howard, R. (1990s). ‘Patchwriting’ এবং ভাষাগত বিকাশের সাথে প্লেজিয়ারিজমের সম্পর্ক বিষয়ক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

