মানব সভ্যতার স্বাদের ইতিহাসে ‘চিনি’ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। আজ আমাদের খাবার টেবিলে যে সাদা দানাদার চিনি আমরা দেখি, তার পেছনের ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি তা এক দীর্ঘ সংঘাত, দাসত্ব এবং অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী। ১৫০০ শতক থেকে ১৯০০ শতক পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনির যে জয়জয়কার ছিল, তা কেবল একটি খাদ্যপণ্যের বিস্তার নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক মহা-আখ্যান।
চিনি বা সুক্রোজ মূলত আখ থেকে পাওয়া এক প্রকার স্ফটিকাকার পদার্থ। খ্রিষ্টীয় ১৫০০ সালের আগে ইউরোপে চিনি ছিল এক দুর্লভ বস্তু। তখন একে মিষ্টি হিসেবে নয়, বরং ‘ফ্লেভারিং স্পাইস’ বা সুগন্ধি মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ভেনিস এবং সিসিলির ব্যবসায়ীরা তৎকালীন অভিজাত শ্রেণীর কাছে চড়া দামে এই পণ্য বিক্রি করতেন। কিন্তু ১৭শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইতালীয় চিনি শিল্পে ধস নামে। এর কারণ ছিল নতুন বিশ্ব (আমেরিকা) থেকে আসা সস্তা এবং দাস-শ্রমনির্ভর চিনির জোয়ার।
১৪৯৩ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন তার দ্বিতীয় অভিযানে বের হন, তখন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ থেকে তিনি আখের চারা সঙ্গে নিয়ে হিস্পানিওলা দ্বীপে পৌঁছান। আমেরিকার ট্রপিক্যাল বা গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ু আখের জন্য স্বর্গভূমি হিসেবে প্রমাণিত হয়। কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই এই চাষাবাদ পুরো ক্রান্তীয় আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে।
আখ চাষের জন্য প্রয়োজন ছিল উর্বর বিশাল ভূখণ্ড, নৌ-চলাচলের উপযোগী উপকূলীয় অঞ্চল এবং প্রচুর জ্বালানি কাঠ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন সস্তা শ্রমশক্তির। আর এই শ্রমের চাহিদাই জন্ম দিয়েছিল ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের—আটলান্টিক দাস ব্যবসা।
শুরুতে স্পেনীয়রা স্থানীয় আদিবাসীদের শ্রমে আখ চাষের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মহামারি ও অত্যাধিক পরিশ্রমে আদিবাসীদের সংখ্যা দ্রুত কমে আসায় ১৫১২ সাল থেকে আফ্রিকা থেকে দাস আমদানির সূচনা হয়। ধীরে ধীরে ‘চিনি’ এবং ‘দাস’ শব্দ দুটি একে অপরের সমার্থক হয়ে ওঠে।
পর্তুগিজ উপনিবেশ ব্রাজিল ছিল চিনি চাষের প্রথম বড় সাফল্যের ক্ষেত্র। ১৬২০-এর দশকে ব্রাজিল বার্ষিক ২০,০০০ টন চিনি উৎপাদন করত। পরবর্তীতে ডাচ, ইংরেজ এবং ফরাসীরাও এই প্রতিযোগিতায় শামিল হয়। বার্বাডোজ, জ্যামাইকা এবং সেন্ট ডমিঙ্গু (হাইতি) হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ‘সুগার আইল্যান্ডস’।
চিনি উৎপাদন ছিল এক জটিল এবং বিরামহীন প্রক্রিয়া। আখের কাণ্ড কেটে তা দ্রুত মাড়াই করতে হতো, কারণ দেরি হলে চিনির গুণমান নষ্ট হয়ে যেত। মাড়াই করার পর রস জ্বাল দিয়ে ঘন করা হতো এবং পরবর্তীতে সেন্ট্রিফিউজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাদামী দানাদার চিনি ও ঝোলা গুড় (molasses) আলাদা করা হতো। এই ঝোলা গুড় থেকে তৈরি হতো সে সময়ের জনপ্রিয় পানীয় ‘রাম’।
১৮৬০ সালে কিউবা একাই ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার টন চিনি উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। সেন্ট ডমিঙ্গুর দাস বিদ্রোহের পর চিনির দাম বেড়ে গেলে কিউবা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রধান চিনি উৎপাদনকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
চিনির সহজলভ্যতা ইউরোপের মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলে দেয়। চা, কফি, কোকো এবং জ্যামের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে চিনির চাহিদাও তুঙ্গে ওঠে। ১৭৫০ সালের দিকে ইউরোপে ব্যবহৃত চিনির ৯০ শতাংশই আসত এই সব দ্বীপপুঞ্জ থেকে।
তবে এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল্য দিতে হয়েছিল প্রকৃতিকে। মাইলের পর মাইল বনাঞ্চল উজাড় করে আখের বাগান করা হয়, যা ওই অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে, আফ্রিকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে সেখানে এক নতুন সংকর সংস্কৃতির জন্ম হয়।
১৯শ শতাব্দীতে চিনির উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে এর দাম কমতে থাকে এবং এটি একটি সাধারণ নিত্যপণ্যে পরিণত হয়। কিন্তু চিনির এই ‘সাদা’ রূপের আড়ালে রয়ে গেছে লাখে লাখে মানুষের শ্রম আর দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। আজ যখন আমরা এক চামচ চিনি কোনো পানীয়তে মেশাই, তখন তা কেবল আমাদের জিভকে তৃপ্ত করে না, বরং কয়েকশ বছরের বিশ্ব ইতিহাসকেও মনে করিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র:
১. Bethell, Leslie (Ed.) – Colonial Brazil (1987)
২. Dunn, Richard S. – Sugar and Slaves (1972)
৩. Sheridan, Richard – Sugar and Slavery: An Economic History (1974)
৪. Noël Deerr – The History of Sugar (1949–1950)

