Wednesday, July 29, 2026
32.2 C
Bangladesh

শতবর্ষ পেরিয়েও অমলিন ‘শুদ্ধতম’ কবি

বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে ক’জন নক্ষত্র নিজ মহিমায় ভাস্বর, তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের নাম অগ্রগণ্য। রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের অন্যতম প্রধান এই কবি তাঁর জীবদ্দশায় ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে, ‘বিবরবাসী’ এক নিভৃতচারী মানুষ। অথচ আজ তাঁর জন্মের সোয়া শতাব্দী পরেও বাঙালির মজ্জায় ও মননে তিনি চিরভাস্বর। নির্জনতা, চিত্ররূপময়তা এবং পরাবাস্তববাদের অনন্য মিশেলে তিনি বাংলা কবিতাকে এক নতুন আধুনিকতা উপহার দিয়েছেন।

১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বরিশাল শহরে এক শিক্ষিত বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশ। তাঁর আদি নিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন আদর্শ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক এবং মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন প্রখ্যাত কবি। মায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘আদর্শ ছেলে’ আজও শিশুদের পাঠ্য। শৈশবে মায়ের কাছেই হাতেখড়ি এবং পরে বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে অসাধারণ সাফল্যের সঙ্গে পাস করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় পাড়ি জমান। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

জীবনানন্দের কবিতায় উঠে এসেছে বাংলার এক ধূসর, বিষণ্ণ অথচ অপরূপ সৌন্দর্য। তিনি শুধু গ্রামবাংলার রূপ আঁকেননি, বরং বাংলার প্রকৃতিকে এক আদিম ও মায়াবী রূপ দিয়েছেন। যে কারণে অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে বলেছিলেন ‘শুদ্ধতম কবি’ এবং বুদ্ধদেব বসু আখ্যা দিয়েছিলেন ‘নির্জনতম কবি’।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

★ঝরা পালক:প্রথম কাব্যগ্রন্থ (১৯২৭)
★ধূসর পাণ্ডুলিপি:যেখানে তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষার প্রকাশ ঘটে।
★বনলতা সেন:বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় প্রেমের কবিতা।
★রূপসী বাংলা:কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত এই গ্রন্থটি তাঁকে বাঙালির জাতীয় আবেগ ও নিসর্গের কবিতে পরিণত করে।

জীবনানন্দের পেশাগত জীবন মোটেও মসৃণ ছিল না। সিটি কলেজ, ব্রজমোহন কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করলেও বারবার তাঁকে বেকারত্বের গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে। সংসারের দারিদ্র্য ঘোচাতে তিনি বীমা কোম্পানির এজেন্ট বা গৃহশিক্ষকতা পর্যন্ত করেছেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর জীবদ্দশায় তিনি মূলত কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয়েছে ২১টি উপন্যাস এবং ১২৮টি ছোটগল্প। ‘মাল্যবান’ বা ‘সুতীর্থ’র মতো উপন্যাসগুলো প্রমাণ করে যে গদ্যেও তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ছিলেন। তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের কাব্যতত্ত্ব আলোচনার এক অমূল্য দলিল।

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। আশ্চর্যজনকভাবে কলকাতায় গত ১০০ বছরে ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র এক—আর তিনি জীবনানন্দ দাশ। অনেক গবেষক একে ‘আত্মহত্যা স্পৃহা’ বললেও কোনো জোরালো প্রমাণ মেলেনি। দীর্ঘ ৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২২ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজকের দিনেও জীবনানন্দ দাশের প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি। তাঁর সাহিত্য পর্যালোচনার জন্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘জীবনানন্দ দাশ রিসার্চ সেন্টার’। ভারত ও বাংলাদেশে তাঁর নামে প্রবর্তিত হয়েছে সাহিত্য পুরস্কার। তাঁর কবিতা আজ ইংরেজি, ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। আধুনিক মননশীল বাঙালির কাছে জীবনানন্দ মানেই সেই ‘তিমিরহননের কবি’ যিনি অন্ধকার পেরিয়ে আলোর গান শোনান।

তথ্যসূত্র:

১. বাংলাপিডিয়া:বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১২)।
২. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান: (সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, ১ম খণ্ড)।
৩. শুদ্ধতম কবি:আবদুল মান্নান সৈয়দ রচিত (১৯৭২)।
৪. জীবনানন্দ দাশ: সিরাজ সালেকীন রচিত জীবনী গ্রন্থমালা (২০১৮)।
৫. আপোয়েট আপার্ট: ক্লিনটন বি. সিলি (কবির জীবনী ও সাহিত্য পর্যালোচনা)।
৬. জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র ও লিটারারি নোটস: (ফয়জুল লতিফ চৌধুরী ও ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদিত)।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...