ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালটি এসেছিল এক চরম অভিশাপ হয়ে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসলীলা কাটিয়ে ওঠার আগেই প্রকৃতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে বাংলাদেশ পড়েছিল এক মহাদুর্যোগের মুখে, যা ইতিহাসে ‘৭৪-এর দুর্ভিক্ষ’ নামে পরিচিত।
১৯৭৪ সালের এই দুর্ভিক্ষের পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না, বরং ছিল একাধিক পরিস্থিতির দুর্ভাগ্যজনক সমন্বয়। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি উপচে পড়ে সে বছর ফসল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ধানের ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় খাদ্যাভাব প্রকট রূপ নেয়। সে সময় চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে বড় একটি কারণ ছিল একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট। তৎকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পিএল-৪৮০ প্রকল্পের আওতায় খাদ্য সহায়তা বন্ধ করে দেয়, যা সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করে।
তৎকালীন সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসা চিত্রগুলো ছিল বুক ফাটানো। কুড়িগ্রামের সেই বিখ্যাত চিলমারীর বাসন্তী’র ছবি হোক কিংবা লঙ্গরখানায় একমুঠো ভাতের জন্য হাজারো মানুষের হাহাকার—সবই ছিল মানবিক বিপর্যয়ের চরম নিদর্শন। সেসময় সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা প্রায় ২৭,০০০ বলা হলেও, বেসরকারি অনেক পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা কয়েক লাখে গিয়ে ঠেকেছিল। সে সময় অনেক মানুষই তাদের কোলের ছোট্ট সন্তানদের বিক্রি করে দেয় শুধু সামান্য কয়টা চালের জন্য। একমুঠো ভাতের জন্য অচেনা মানুষের হাত ধরে অনেকের সহধর্মিণী কিংবা ছোট্ট তরুণীরা পালিয়ে যান। সেসময় এসব নিয়ে তাদের এত ভয় ছিল না, আপনার পেটে যখন ভাত নেই এবং খাবার দেবার কেউ নেই, তখন আসলে এসব নিয়ে কে ভাবতে যায়।অধিকাংশ মানুষ সেসময় অর্ধেক খালি পেটে যন্ত্রণা আঁকড়ে বেঁচে ছিল।
মায়েদের কোন বুকের দুধ ছিল না। তাদের শরীরে তখন শুধু মাংসবিহীন হাড্ডি। অনেক বাচ্চা জন্মের সময় মারা যায়, তাদের মা-ও মারা যায়। এমনকি যারা স্বাস্থ্যবান জন্মেছিল তারা বড় হতে হতে ক্ষুধার যন্ত্রণায় মারা যায়। অনেক নারী ক্ষুদার যন্ত্রণা সইতে না পেরে সেসময় আত্মহত্যা করেন।
সেই দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে গেছে: খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ কৃষিতে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে আজ দেশ অনেকটা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
১৯৭৪-এর সেই দুর্ভিক্ষ আমাদের শিখিয়ে গেছে যে, কেবল স্বাধীনতা নয়, ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রের জন্য কতটা জরুরি।
আজকের আধুনিক বাংলাদেশ যখন ডিজিটাল এবং স্মার্ট হওয়ার পথে হাঁটছে, তখন অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে রাখা জরুরি। দুর্ভিক্ষ এখন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিলেও, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল অনেক এবং জটিল, আর সেসব নিয়ে এখনো বিতর্ক চলে। তবে এনিয়ে কোন স্মৃতিস্তম্ভ নেই, যাদুঘর নেই এমনকি বিশ্বের কোথাও এই মারা যাওয়া মানুষগুলো স্মরণে একটা ফলকও করা হয়নি।

