আজ, ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার। ক্যালেন্ডারের পাতায় এই দিনটি পিৎজা প্রেমীদের জন্য এক মহোৎসবের দিন। এক সময় যা ছিল কেবল ইতালির দরিদ্র শ্রমিকদের সস্তা আহার, আজ তা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় আভিজাত্যপূর্ণ খাবারে পরিণত হয়েছে। নেপলসের অলিগলি থেকে শুরু করে আমেরিকার ব্যস্ত শহর হয়ে মহাকাশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এই ‘চিজি ডিস্ক’।
পিৎজার আদি ইতিহাস:
সাধারণ থেকে অসাধারণ যদিও প্রাচীন মিশর, রোম এবং গ্রিসে বিভিন্ন টপিংসহ ফ্ল্যাটব্রেড বা চ্যাপ্টা রুটি খাওয়ার চল ছিল, তবে আধুনিক পিৎজার জন্মস্থান হিসেবে ধরা হয় দক্ষিণ ইতালির নেপলস (Naples) শহরকে। ১৭০০ এবং ১৮০০-এর দশকে নেপলস ছিল একটি জনাকীর্ণ বন্দরনগরী। সেখানকার কর্মজীবী দরিদ্র মানুষ, যাদের স্থানীয়ভাবে ‘লাজারোনি’ বলা হতো, তাদের জন্য এমন একটি খাবারের প্রয়োজন ছিল যা সস্তা এবং দ্রুত খাওয়া যায়।
এই প্রয়োজন থেকেই পিৎজার উদ্ভব। প্রথম দিকের এই পিৎজাগুলোতে টমেটো, পনির, তেল, রসুন এবং অ্যাঙ্কোভি মাছ ব্যবহার করা হতো। মজার ব্যাপার হলো, সে সময়কার উচ্চবিত্ত ইতালীয় লেখকরা এই খাবারটিকে ‘ঘৃণ্য’ বা ‘নোংরা’ বলে অবজ্ঞা করতেন।
রানী মার্গারিটা এবং ঐতিহাসিক মোড়
পিৎজার ভাগ্যে বড় পরিবর্তন আসে ১৮৮৯ সালে। ইতালির রাজা প্রথম উমবার্তো এবং রানী মার্গারিটা যখন নেপলস ভ্রমণে যান, তখন তারা ফ্রেঞ্চ খাবারের একঘেয়েমি কাটাতে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে চান। পিজেরিয়া ব্র্যান্ডি (Pizzeria Brandi) থেকে তাদের জন্য বিভিন্ন স্বাদের পিৎজা পরিবেশন করা হয়। রানী মার্গারিটা বিশেষ করে এমন একটি পিৎজা পছন্দ করেন যাতে ছিল লাল টমেটো, সাদা মোজারেলা পনির এবং সবুজ বেসিল পাতা—যা অনেকটা ইতালির জাতীয় পতাকার রঙের মতো। রানীর সম্মানে এই পিৎজার নাম দেওয়া হয় ‘মার্গারিটা পিৎজা’।
আমেরিকার জয় ও বিশ্বায়ন উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইতালীয় অভিবাসীদের হাত ধরে পিৎজা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে। ১৯০৫ সালে নিউ ইয়র্কের লিটল ইতালিতে আমেরিকার প্রথম পিজেরিয়া’জি.লোম্বার্ডি’স’ (G.Lombardi’s) যাত্রা শুরু করে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এটি কেবল ইতালীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যুদ্ধের পর যখন আমেরিকান সৈন্যরা ইতালি থেকে ফিরে আসে, তারা এই খাবারের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ সাথে করে নিয়ে আসে। ১৯৪৩ সালে শিকাগোতে উদ্ভাবিত হয় ‘ডিপ-ডিশ’ পিৎজা, যা পিৎজাকে একটি নতুন মাত্রা দেয়।
পরিসংখ্যানের পাতায় পিৎজা
বর্তমানে পিৎজা কেবল একটি খাবার নয়, এটি একটি বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। এক জরিপে দেখা গেছে:
★আমেরিকার মোট রেস্তোরাঁর প্রায় ১৭% হচ্ছে পিজেরিয়া।
★প্রতি বছর কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই ২৫১.৭ মিলিয়ন পাউন্ড পেপারোনি পিৎজার টপিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
★প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৫০ স্লাইস পিৎজা বিক্রি হয়।
★বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন পিৎজা বিক্রি হয়।
আমেরিকানদের কাছে পিৎজা কতটা জনপ্রিয় তা বোঝা যায়, একটি মজার তথ্যে_সমীক্ষা বলছে, ৩% আমেরিকান তাদের জীবনসঙ্গীর চেয়ে পিৎজাকে বেশি গুরুত্ব দেন! এছাড়া হ্যামবার্গারের পর এটিই আমেরিকার দ্বিতীয় জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড।
পিৎজা ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা (র্যাঙ্কিং)
আমেরিকার জনপ্রিয় পিৎজা ব্র্যান্ডগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো: ১. পিৎজা হাট (৩১%) ২. পাপা জন’স (২২%) ৩. ডমিনো’স (১৭%) ৪. লিটল সিজার’স (৮%) ৫. ক্যালিফোর্নিয়া পিৎজা কিচেন (২.৮%)
পিৎজা নিয়ে কিছু বিস্ময়কর তথ্য
মহাকাশে পিৎজা:
★ ২০০১ সালে পিৎজা হাট প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পিৎজা ডেলিভারি দিয়ে ইতিহাস গড়ে।
★বিশ্বের সবচেয়ে দামী পিৎজা: ইতালিতে তৈরি ‘লুই ত্রয়োদশ’ (Louis XIII) পিৎজাটির দাম প্রায় ১২,০০০ ডলার। এটি তৈরি করতে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে।
★বিশ্বের বৃহত্তম পিৎজা: ২০২৩ সালে রেকর্ড গড়া বৃহত্তম পিৎজাটির আয়তন ছিল প্রায় ১৩,৯৫৭.৭৭ বর্গফুট।
পিৎজা তৈরির সহজ ঘরোয়া রেসিপি:
১. ময়দার খামির: কুসুম গরম জল, চিনি এবং ইস্ট মিশিয়ে ৫-১০ মিনিট রাখুন। এরপর ময়দা ও লবণের সাথে মিশিয়ে ভালো করে মেখে ১-২ ঘণ্টা রেখে দিন যতক্ষণ না এটি ফুলে দ্বিগুণ হয়।
২. সস তৈরি: টমেটো পেস্ট, রসুন কুচি, ওরেগানো এবং বেসিল পাতা মিশিয়ে সস তৈরি করুন।
৩. বেক করা: ওভেন ৪৭৫-৫০০ ফারেনহাইটে প্রি-হিট করুন। রুটি বেলে তার ওপর সস, মোজারেলা পনির এবং টপিং দিয়ে ১০-১৫ মিনিট বেক করুন।
পিৎজা এখন কেবল ময়দা আর চিজের গোল চাকতি নয়, এটি আড্ডা আর উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডায়েট সচেতনদের জন্য এখন গ্লুটেন-ফ্রি বা ভেগান পিৎজার অপশনও রয়েছে। তাই আজ ডায়েট ভুলে অন্তত এক স্লাইস পিৎজা খেয়ে দিনটি উদযাপন করাই যায়।

