পরিবেশ রক্ষা এবং প্রবাল প্রাচীরের ক্ষয় রোধে সরকারের কঠোর নির্দেশনার পর গত ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত আগামী ৯ মাসের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘ ব্যস্ততার পর প্রবাল দ্বীপটি এখন এক নির্জন ও শান্ত রূপ ধারণ করেছে।
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও অপার সম্ভাবনার দ্বার সেন্টমার্টিন। নীল আকাশ আর সমুদ্রের নীলজল যেন চুপি চুপি ডাক দিয়ে যায়! সমুদ্রের নীল নির্মলতা সেন্টমার্টিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ‘দক্ষিণের স্বর্গ’ সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য বিভিন্ন কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে! দ্বীপটির অবস্থান মূলত বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিকে।
১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে আগামী ১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্বীপের ভঙ্গুর ইকোসিস্টেম এবং জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতেই এই দীর্ঘ বিরতি। ২০২৫-২৬ পর্যটন মৌসুমে (নভেম্বর-জানুয়ারি) প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেছেন। তবে এবার বিধি-নিষেধের কারণে রাত যাপনের সুযোগ ছিল সীমিত। নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার পরপরই দ্বীপের প্রকৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
পর্যটক প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকায় ছেঁড়াদিয়া অংশে আবারও সামুদ্রিক শামুক-ঝিনুকের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। সৈকতে বারবিকিউ পার্টি এবং অতিরিক্ত আলোর ব্যবহার বন্ধ হওয়ায় সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার পরিবেশ ফিরে আসছে। এছাড়াও জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সাগরে প্লাস্টিক বর্জ্য নিক্ষেপের মাত্রা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
পর্যটন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে। দ্বীপের প্রায় ১০ হাজার মানুষের অধিকাংশই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বর্তমানে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পর্যটন ছেড়ে পুনরায় মাছ ধরা বা কৃষি কাজে ফিরে যাচ্ছেন। যাতায়াতের জন্য পর্যটনবাহী জাহাজ বন্ধ থাকায় এখন কেবল পণ্যবাহী ট্রলারই মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে সেন্টমার্টিন সংলগ্ন সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের কড়া নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। নাফ নদী এবং বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় বাংলাদেশি টহল দল সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। দ্বীপ দখল বা বড় কোনো সংকটের যে গুজব মাঝে মাঝে ছড়িয়েছে, সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী তা ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত করেছে।
১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমরান হোসাইন সজীব জানান, গত ১লা ফেব্রুয়ারী থেকে পর্যটকবাহী সকল প্রকার জাহাজ চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সরকার যদি এ বিষয়ের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় সেক্ষেত্রে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে যাতে আগামী মৌসুমে (নভেম্বর ২০২৬) ভ্রমণের সময় তারা নির্দিষ্ট নিয়মাবলি এবং ‘ট্রাভেল পাস’ ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পর্যটনে অংশ নিতে পারেন।

