অক্টোবরে ঘোষিত তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’র পর গাজায় সবচেয়ে ভয়াবহ একটি দিন পার হলো। ইসরায়েলি বাহিনীর বেপরোয়া হামলায় বুধবার একদিনেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮ ফিলিস্তিনি। অন্যদিকে, রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গুরুতর আহত ও অসুস্থ রোগীদের বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়াটিও হঠাৎ স্থগিত করা হয়েছে।
মৃত্যুর মিছিল ও গণহত্যার অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি আগ্রাসন থামেনি। বরং, এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ৫২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে, গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ৭১,৮০৩ ছাড়িয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘ ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) এ নিয়ে বিচারও চলছে। সরেজমিনে, গাজার খান ইউনিস থেকে সাংবাদিক আবু আজজুম জানান, যুদ্ধবিরতি কেবল কাগজে-কলমেই আছে, বাস্তবে গাজাবাসীর জীবনে এক মুহূর্তের স্বস্তি নেই।
হামলার নতুন কৌশল ও অজুহাত
গত কয়েক ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা এবং ড্রোন ওড়ার শব্দ বেড়ে গেছে, যা বড় ধরনের হামলারই ইঙ্গিত। বুধবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে একাধিক শিশুও রয়েছে। বিশেষ করে, উত্তর গাজায় গোলাবর্ষণে ১৪ জন এবং দক্ষিণ গাজার কিজান আবু রাশওয়ান এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে হামলায় আরও ৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তাদের একজন রিজার্ভ অফিসার গুলিবিদ্ধ হওয়ার জবাবেই তারা এই হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনাটি ঘটেছে ‘ইয়েলো লাইন’ বা ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমানার কাছে। তবে, স্থানীয়দের অভিযোগ, ইসরায়েল ক্রমাগত এই সীমানা পরিবর্তন করে তাদের আরও কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
রোগী স্থানান্তরে বাধা ও অজুহাত
ইসরায়েলি হামলার তীব্রতার মধ্যেই রাফাহ সীমান্ত দিয়ে রোগী স্থানান্তরের তৃতীয় ধাপটি বাতিল করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (PRCS) জানিয়েছে, বুধবার সকালে ইসরায়েল আকস্মিকভাবে এই সমন্বয় বাতিল করে দেয়। অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী, অসুস্থদের প্রাথমিক চেকআপের পর মিশরে পাঠানোর কথা ছিল।
এর আগে, সোমবার ৫ জন এবং মঙ্গলবার ১৬ জনকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও, তা প্রতিশ্রুত দৈনিক ৫০ জনের তুলনায় নগণ্য। এখন ইসরায়েল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা না দেওয়ার অভিযোগ তুলছে। যদিও, গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় ১৮,০০০ রোগী বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় আছেন এবং তাদের অনেকের অবস্থাই সংকটাপন্ন।
প্রত্যাবর্তনেও হয়রানি
গাজার একমাত্র প্রবেশপথ রাফাহ ক্রসিং খুললেও সেখানে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শুধুমাত্র যারা যুদ্ধের সময় গাজা ছেড়েছিলেন এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদেরই ফিরতে দেওয়া হচ্ছে। ফিরে আসা ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করেছেন, যাত্রাপথে তাদের চোখ বেঁধে রাখা, হাতকড়া পরানো এবং এমনকি যৌন হয়রানি করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরেও রক্তপাত
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার রাতে জেরিকো শহরে এক অভিযানে সাঈদ নাঈল আল-শেখ নামে ২৪ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি তরুণকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

