Friday, May 8, 2026
33.2 C
Bangladesh

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর (রহঃ) বিস্ময়কর ইতিহাস!

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে, যা মহাকালের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে যায়। নিঃসন্দেহে, সুলতান সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব (রহঃ) ছিলেন তেমনই—এক কালজয়ী মহাপুরুষ। তিনি শুধু একজন মহান বিজেতাই ছিলেন না, বরং ছিলেন ন্যায়বিচার ও মানবতার মূর্ত প্রতীক। মুসলিম বিশ্বে তিনি ‘সালাহউদ্দিন’ এবং পশ্চিমা বিশ্বে ‘সালাদিন’ নামে পরিচিত। তিনি ক্রুসেডারদের হাত থেকে জেরুজালেম মুক্ত করে মুসলিমদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছিলেন।একইসাথে, তিনি আইয়ুবী সালতানাতের গোড়াপত্তন করেন।

প্রথম অধ্যায়: জন্ম ও বংশপরিচয় :

সালাহউদ্দিন ১১৩৭ মতান্তরে ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের তিকরিত শহরে জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখযোগ্য যে, তিনি আরব ছিলেন না, বরং কুর্দি বংশোদ্ভূত ছিলেন। তার বাবার নাম ছিল নাজমুদ্দিন আইয়ুব এবং দাদার নাম শাদি ইবনে মারওয়ান। তৎকালীন সময়ে, তার বাবা তিকরিত দুর্গের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

সালাহউদ্দিনের জন্মের রাতটি ছিল তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত নাটকীয়। কারণ, রাজনৈতিক কারণে ঠিক সেই রাতেই তার বাবাকে পরিবার নিয়ে তিকরিত ছাড়তে হয়েছিল। ফলে, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করে তার পরিবার। অবশেষে, মসুলের তুর্কি শাসক ইমাদউদ্দিন জঙ্গি তাদের আশ্রয় দেন। সালাউদ্দিনের বাবা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক। তাই, ইমাদউদ্দিন জঙ্গি তাকে বালবেক শহরের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। এখানেই সালাহউদ্দিনের শৈশবের দিনগুলো কাটে।

দ্বিতীয় অধ্যায়: শিক্ষা ও বেড়ে ওঠা :

বাল্যকালে সালাহউদ্দিন দামেস্কে চলে আসেন। সেখানে, তিনি তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম ও পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ করেন। শুরু থেকেই, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের। তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ করেন এবং হাদিস শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া, ফিকহ বা ইসলামী আইনশাস্ত্র এবং আরবদের বংশলতিকা সম্পর্কে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল।

তবে, তিনি শুধু ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। একইসাথে, তিনি গণিত, জ্যামিতি এবং জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যয়ন করেন। পাশাপাশি, তিনি সামরিক প্রশিক্ষণেও নিজেকে দক্ষ করে তোলেন। তার চাচা আসাদুদ্দিন শিরকোহ ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম সেরা সেনাপতি। মূলত, চাচার কাছেই তিনি তলোয়ার চালনা, বর্শা নিক্ষেপ এবং ঘোড়দৌড়ের কৌশল রপ্ত করেন। এভাবে, জ্ঞান ও শক্তির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটে তার মাঝে।

কর্মজীবনের সূচনা ও মিশর অভিযান :

সালাহউদ্দিনের কর্মজীবন শুরু হয় দামেস্কের শাসক সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গির সেনাবাহিনীতে। সে সময়, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। মিশরে তখন ফাতিমি খিলাফত শাসন করছিল। কিন্তু, শিয়া মতাদর্শী এই শাসকরা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত ছিল। অন্যদিকে, ক্রুসেডাররা মিশর দখলের পাঁয়তারা করছিল।

এই পরিস্থিতিতে, নুরুদ্দিন জঙ্গি মিশরে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সেনাপতি শিরকোহকে একটি বিশাল বাহিনী দিয়ে মিশরে পাঠান। স্বাভাবিকভাবেই, তরুণ সালাহউদ্দিন চাচার সাথে এই অভিযানে যোগ দেন। যদিও, প্রথমে তিনি এই অভিযানে যেতে চাননি, কিন্তু নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে যায়। মিশরে পৌঁছে তিনি অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেন। অবশেষে, ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করে শিরকোহ মিশরের নিয়ন্ত্রণ নেন।

মিশরের উজির ও ক্ষমতার পালাবদল :

১১৬৯ সালে চাচা শিরকুহ হঠাৎ ইন্তেকাল করেন। তখন, মিশরের ফাতিমি খলিফা আল-আদিদ নতুন উজির নিয়োগের সংকটে পড়েন। অবশেষে, তিনি সালাউদ্দিনকে উজির হিসেবে বেছে নেন। খলিফা ভেবেছিলেন, সালাহউদ্দিন বয়সে তরুণ ও অনভিজ্ঞ, তাই তাকে হাতের পুতুল বানিয়ে রাখা যাবে।

কিন্তু, সালাহউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। দায়িত্ব নেওয়ার পর, তিনি দ্রুত নিজের অবস্থান শক্ত করেন। তিনি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নিজের বিশ্বস্ত লোকদের নিয়োগ দেন। ধীরে ধীরে, তিনি ফাতিমি প্রভাব খর্ব করতে থাকেন। ১১৭১ সালে তিনি এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মিশরে শিয়া ফাতিমি খিলাফতের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। এর পরিবর্তে, জুমার খুতবায় বাগদাদের সুন্নি আব্বাসীয় খলিফার নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে, দীর্ঘ ২০০ বছর পর মিশর পুনরায় সুন্নি শাসনের অধীনে ফিরে আসে।

সিরিয়া ও মিশরের একত্রীকরণ :

১১৭৪ সালে সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গি ইন্তেকাল করেন। তখন, সিরিয়ায় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। বিভিন্ন আমিররা নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে বিবাদে লিপ্ত হন। এই সুযোগে, ক্রুসেডাররা মুসলিমদের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। সালাউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, মিশর ও সিরিয়া এক না হলে জেরুজালেম মুক্ত করা অসম্ভব।

তাই, তিনি দামেস্কের দিকে অগ্রসর হন। দামেস্কের জনগণ তাকে সাদরে বরণ করে নেয়। পরবর্তীতে, তিনি আলেপ্পো এবং মসুলও জয় করেন। দীর্ঘ  ১০ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি মিশর, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং হিজাজকে এক পতাকার নিচে নিয়ে আসেন। এভাবে, তিনি মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করেন, যা ছিল আসন্ন মহাযুদ্ধের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ।

ক্রুসেডারদের বিশ্বাসঘাতকতা ও সালাহউদ্দিনের শপথ :

সে সময় ফিলিস্তিনের জেরুজালেম এবং উপকূলীয় এলাকাগুলো ক্রুসেডারদের দখলে ছিল। বিশেষ করে, ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় তারা জেরুজালেমে যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল, মুসলিম বিশ্ব তা ভোলেনি। তদুপরি, সালাহউদ্দিনের সময়ে ক্রুসেডাররা বারবার শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করছিল।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহঃ)

ক্রুসেডার নেতা রেনল্ড ডি চ্যাটিলন ছিল এক বড় অপরাধী। সে কেরাক দুর্গে বসে মুসলিম বণিক ও হজযাত্রীদের কাফেলার ওপর হামলা চালাত। একবার, সে মক্কা ও মদিনা আক্রমণের ধৃষ্টতা দেখায়। তাছাড়া, সে মুসলিম বন্দিদের নির্মমভাবে হত্যা করত এবং নবীজী (সাঃ)-কে নিয়ে কটূক্তি করত। এইসংবাদশুনে, সালাহউদ্দিন রাগে ফেটে পড়েন। তখনই, তিনি শপথ করেন যে, রেনল্ডকে তিনি নিজ হাতে শাস্তি দেবেন এবং জেরুজালেম মুক্ত করবেন।

হিত্তিনের যুদ্ধ – ইতিহাসের মোড় ঘোরানো লড়াই :

১১৮৭ সালের ৪ জুলাই। হিত্তিন প্রান্তর। সেদিন  সালাহউদ্দিনের সেনাবাহিনী এবং ক্রুসেডারদের বিশাল বাহিনী মুখোমুখি হয়। প্রথমে, সালাহউদ্দিন এক অসাধারণ কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি ক্রুসেডারদের এমন এক জায়গায় অবরুদ্ধ করেন যেখানে পানির কোনো উৎস ছিল না। দিনটি ছিল প্রচণ্ড গরম।

মুসলিম বাহিনী পানির সব উৎস আগেই দখল করে নিয়েছিল। অপরদিকে, সালাউদ্দিনের সৈন্যরা শুকনো ঘাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে, আগুনের ধোঁয়া এবং পানির পিপাসায় ক্রুসেডাররা দিশেহারা হয়ে পড়ে। অবশেষে, মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে ক্রুসেডার বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ইতিহাস এই যুদ্ধকে ‘হিত্তিনের যুদ্ধ’ নামে চেনে। এই যুদ্ধে জেরুজালেমের রাজা গাই এবং কুখ্যাত রেনল্ড ডি চ্যাটিলন বন্দি হন। সালাউদ্দিন তার শপথ অনুযায়ী রেনল্ডকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে, রাজা গাইকে তিনি সম্মান জানিয়ে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখেন।

জেরুজালেম বিজয় ও অনন্য মহানুভবতা :

হিত্তিনের বিজয়ের পর জেরুজালেমের দরজা কার্যত খুলে যায়। ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন জেরুজালেম অবরোধ করেন। শহরের ভেতরে তখন বালিয়ান নামক এক ফরাসি নাইট নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। প্রায় ১২ দিন অবরোধের পর খ্রিস্টানরা বুঝতে পারে যে পরাজয় নিশ্চিত। অবশেষে, ২ অক্টোবর ১১৮৭ সালে, পবিত্র রজব মাসের জুমার দিনে সালাউদ্দিন বিজয়ীর বেশে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন।

দীর্ঘ ৮৮ বছর পর বাইতুল মুকাদ্দাসে আবার আজানের সুমধুর ধ্বনি শোনা যায়। আল-আকসা মসজিদের মিম্বর পুনরায় স্থাপন করা হয়। কিন্তু, সালাহউদ্দিনের এই বিজয় ছিল রক্তপাতহীন। ১০৯৯ সালে খ্রিস্টানরা যখন এই শহর দখল করেছিল, তখন তারা মুসলিমদের রক্তে বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। বিপরীত দিকে, সালাউদ্দিন প্রতিশোধ নেননি। বরং, তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তিনি আদেশ দেন, খ্রিস্টানদের গির্জাগুলো যেন অক্ষত থাকে।

চুক্তি অনুযায়ী, যারা মুক্তিপণ দিতে পারবে, তারা নিরাপদে চলে যেতে পারবে। কিন্তু, হাজার হাজার দরিদ্র খ্রিস্টান মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল। তখন, সালাহউদ্দিন এবং তার ভাই আল-আদিল নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে হাজার হাজার বন্দিকে মুক্ত করে দেন। এমনকি, তিনি বৃদ্ধ, নারী এবং শিশুদের বিনা মুক্তিপণেই ছেড়ে দেন। তার এই দয়া ও মহানুভবতা দেখে অনেক খ্রিস্টান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকরাও সালাহউদ্দিনের এই ব্যবহারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

তৃতীয় ক্রুসেড ও রাজা রিচার্ড :

জেরুজালেম পতনের খবর ইউরোপে পৌঁছালে সেখানে হাহাকার পড়ে যায়। তৎক্ষণাৎ, পোপ নতুন ক্রুসেড ঘোষণা করেন। ফলে, ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট, ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ এবং জার্মানির রাজা ফ্রেডরিক বারবারোসা বিশাল বাহিনী নিয়ে ফিলিস্তিনের দিকে রওনা হন। এটি ছিল ইতিহাসের বিখ্যাত তৃতীয় ক্রুসেড।

বিশেষ করে, রিচার্ড এবং সালাউদ্দিনের লড়াই ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। একর শহরের পতনের পর মুসলিমরা কিছুটা পিছু হটে। কিন্তু, সালাহউদ্দিন তার গেরিলা কৌশলে রিচার্ডকে নাজেহাল করে তোলেন। তিনি রিচার্ডকে জেরুজালেমের দিকে এগোতে দেননি।

সালাহউদ্দিন ও রিচার্ডের শিভালরি (বীরত্ব ও ভদ্রতা) :

যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও সালাহউদ্দিন এবং রিচার্ডের মধ্যে এক অদ্ভুত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল। তারা একে অপরকে শত্রু ভাবলেও, বীর হিসেবে সম্মান করতেন। উদাহরণস্বরূপ, আর্সুফের যুদ্ধের সময় রিচার্ডের ঘোড়া মারা যায়। তখন, সালাহউদ্দিন দেখলেন, প্রতিপক্ষের রাজা পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করছেন। তিনি বললেন, “একজন রাজার পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করা শোভা পায় না।” সাথে সাথে, তিনি রিচার্ডের জন্য দুটি তেজি আরবীয় ঘোড়া উপহার পাঠান।

রাজা রিচার্ডের বিরুদ্ধে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহঃ) একাধারে বীরত্ব, মানবতা ও মহানুভবতার পরিচয় দেন।

আবার, একবার রিচার্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে সালাহউদ্দিন তার জন্য নিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসক পাঠান। শুধু তাই নয়, জ্বরের উপশমের জন্য তিনি বরফ এবং তাজা ফল পাঠান। বিশ্ব ইতিহাসে এমন শত্রুতার নজির বিরল। এই ঘটনার মাধ্যমে সালাউদ্দিন প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি শুধু একজন যোদ্ধা নন, একজন মহৎ হৃদয়ের মানুষও বটে।

রামলার সন্ধি ও যুদ্ধের সমাপ্তি :

দীর্ঘদিন যুদ্ধের পর উভয় পক্ষই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রিচার্ড বুঝতে পারেন, সালাহউদ্দিন জীবিত থাকতে জেরুজালেম দখল করা অসম্ভব। অন্যদিকে, রিচার্ডের নিজ দেশেও ভাইয়ের বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। অবশেষে, ১১৯২ সালে দুই নেতার মধ্যে ‘রামলার সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হয়।

এই সন্ধির শর্তানুযায়ী, জেরুজালেম মুসলিমদের দখলেই থাকে। তবে, খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের নিরাপদে যাতায়াত ও ধর্মপালনের অনুমতি দেওয়া হয়। উপকূলীয় কিছু শহর ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। রিচার্ড সালাউদ্দিনের প্রশংসা করতে করতে ইউরোপে ফিরে যান। সালাহউদ্দিন প্রমাণ করেন, তিনি শুধু যুদ্ধ করতেই জানেন না, শান্তি প্রতিষ্ঠা করতেও জানেন।

শাসক ও সংস্কারক সালাহউদ্দিন :

সালাহউদ্দিন শুধু যুদ্ধের ময়দানেই সফল ছিলেন না, শাসক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসামান্য। ক্ষমতায় আসার পর, তিনি মিশরের কায়রোতে বিশাল দুর্গ নির্মাণ করেন, যা আজও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তাছাড়া, তিনি শিক্ষা বিস্তারে অসংখ্য মাদ্রাসা এবং হাসপাতাল নির্মাণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র সুশিক্ষাই জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে।

তিনি সুন্নি মতাদর্শ প্রচারের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার শাসনামলে, কৃষি ও বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। তিনি কর কমিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে সাধারণ মানুষের কষ্ট না হয়। বিশেষ করে, তিনি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ঔষধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। তার সময়ে মিশরের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল।

04
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহঃ) শাসক হিসেবেও ছিলেন অসামান্য।

বিচারব্যবস্থায় সালাহউদ্দিন

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সালাউহদ্দিন ছিলেন আপোষহীন। একবার, তার বিরুদ্ধে এক ইহুদি ব্যবসায়ী কাজীর (বিচারক) কাছে নালিশ করে। অভিযোগ ছিল, সালাউহদ্দিন তার জমি অন্যায়ভাবে দখল করেছেন। কাজী সালাউদ্দিনকে আদালতে তলব করেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি সুলতান হয়েও সাধারণ মানুষের মতো বিচারকের সামনে উপস্থিত হন। তিনি কোনো প্রটোকল বা নিরাপত্তা ছাড়াই আদালতে যান। যদিও বিচারে দেখা যায় জমিটি সালাউদ্দিনেরই ছিল এবং দলিল সঠিক ছিল। তবুও, তিনি ওই ইহুদি ব্যবসায়ীকে হতাশ করেননি। তিনি জমিটি তাকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন এবং তার সাহসের প্রশংসা করেন। তিনি বলতেন, “ন্যায়বিচার হলো রাজত্বের ভিত্তি। যেখানে ন্যায়বিচার নেই, সেখানে শান্তি নেই।”

ব্যক্তিগত জীবন ও অনাড়ম্বরতা :

সালাহউদ্দিন ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন চরম অনাড়ম্বর ও সাধাসিধে। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি কখনো রাজকীয় পোশাক পরতেন না। তিনি সাধারণ সুতি বা পশমী কাপড় পরতেন। বিলাসিতা তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি রাজপ্রাসাদের চেয়ে যুদ্ধের ময়দানের তাবুতেই থাকতে বেশি পছন্দ করতেন।

তিনি নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতেন এবং তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। যুদ্ধক্ষেত্রেও, তাঁর তাবু ছিল সাধারণ সৈনিকদের মতোই। তিনি তাঁর সৈন্যদের নিজের সন্তানের মতো দেখতেন। মাঝেমধ্যে, তিনি ছদ্মবেশে শহরের অবস্থা দেখতে বের হতেন। তার হাসি ছিল সর্বদা নম্র এবং অমায়িক। তিনি কখনো কাউকে কটু কথা বলতেন না।

ইন্তেকাল ও শেষ নিঃশ্বাস :

১১৯৩ সাল। রিচার্ড চলে যাওয়ার পর সালাউহদ্দিন দামেস্কে ফিরে আসেন। কিন্তু, দীর্ঘ ক্লান্তি এবং অসুস্থতা তাকে গ্রাস করে। তিনি বিলিয়াস ফিভার বা পিত্তজ্বরে আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে, তার স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে।

অবশেষে, ৪ মার্চ ১১৯৩ সালে, ফজরের নামাজের পর এই মহান সুলতান ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৫ বা ৫৬ বছর। মৃত্যুর পর এক অবিশ্বাস্য ও হৃদয়বিদারক সত্য প্রকাশিত হয়। তার ব্যক্তিগত সিন্দুক খোলার পর দেখা গেল, সেখানে মাত্র একটি স্বর্ণমুদ্রা এবং ৪৭টি রৌপ্যমুদ্রা আছে। যা দিয়ে তার দাফন-কাফনের খরচও মেটানো সম্ভব ছিল না। কারণ, তিনি তার সব সম্পদ জীবদ্দশায় দান করে দিয়েছিলেন। অবশেষে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তার দাফন সম্পন্ন হয়। তাকে দামেস্কে উমাইয়া মসজিদের পাশে দাফন করা হয়।

সালাহউদ্দিনের উত্তরাধিকার ও প্রভাব :

সালাহউদ্দিন মারা গেলেও তার প্রভাব আজও বিদ্যমান। তিনি আইয়ুবী বংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা প্রায় এক শতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্য শাসন করেছে। কিন্তু, তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো তার আদর্শ। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে না যদি তার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় থাকে।

পাশ্চাত্যের সাহিত্য ও ইতিহাসে সালাহউদ্দিনকে ‘শিভালরি’ বা বীরত্বের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। দান্তে আলিঘিয়েরি তার ‘ডিভাইন কমেডি’তে সালাহউদ্দিনকে সম্মানজনক স্থানে রেখেছেন। স্যার ওয়াল্টার স্কট তার ‘দ্য তালিসমান’ উপন্যাসে সালাহউদ্দিনের মহানুভবতা তুলে ধরেছেন।

সালাহউদ্দিন আয়ুবী (রহঃ) ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি তরবারির চেয়ে ভালোবাসাকে বেশি শক্তিশালী মনে করতেন। তিনি জয় করেছিলেন জেরুজালেম, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিজয় ছিল মানুষের হৃদয় জয় করা। আজকের সংঘাতময় ও দাঙ্গাপূর্ণ পৃথিবীতে তার জীবন ও কর্ম অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও মাটির মানুষ হওয়া যায়।

তিনি শিখিয়েছেন, শত্রুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করা দুর্বলতা নয়, বরং তা বীরত্বের সর্বোচ্চ শিখর। জেরুজালেমের প্রতিটি পাথর, দামেস্কের প্রতিটি অলিগলি আজও তার স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করছে। যতদিন পৃথিবী থাকবে, ততদিন সুলতান সালাহউদ্দিন আয়ুবী (রহঃ) ন্যায়বিচার, বীরত্ব এবং মানবতার প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবেন।

লেখক : আরেফিন আল ইমরান (সঙ্গীত পরিচালক ও সাংবাদিক)।


সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি (References):

১. আল-বিদায়াওয়াননিহায়া(Al-Bidaya wa’l-Nihaya) – হাফিজইবনেকাসির(রহঃ)। (ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস, যেখানে সালাহউদ্দিনের শাসনকাল ও চরিত্র বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে)।
২. দ্যলাইফঅবসালাদিন(The Life of Saladin) – বাহাউদ্দিনইবনেশাদ্দাদ। (তিনি ছিলেন সালাহউদ্দিনের ব্যক্তিগত সচিব এবং বিচারক। সালাউদ্দিনের জীবনের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার লেখা এই বইটি সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিল)।
৩. এহিস্ট্রিঅবদ্যক্রুসেডস(A History of the Crusades) – স্টিভেনরানসিম্যান। (ক্রুসেড যুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস এবং সালাহউদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি)।
৪. সালাদিন: দ্যহিরোঅবইসলাম(Saladin: Hero of Islam) – জিওফ্রেহেইন্ডস। (আধুনিক ইংরেজি জীবনীগ্রন্থ যা তার কৌশল ও রাজনীতির ওপর আলোকপাত করে)।
৫. সুলতানসালাউদ্দিনআইয়ুবী – কাজীআবুলহোসেন। (বাংলা ভাষায় রচিত সালাহউদ্দিনের ওপর অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় জীবনী)।
৬. আল-কামিলফিততারিখ(The Complete History) – ইবনেআল-আসির। (সালাহউদ্দিনের সমসাময়িক আরেকজন বিখ্যাত ঐতিহাসিকের লেখা, যেখানে যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ আছে)।
৭. দাস্তানঈমানফরোশোঁকি – ইনায়েতউল্লাহআলতামাশ। (ঐতিহাসিক উপন্যাসের আদলে সালাউদ্দিনের সময়ের চিত্র ও গুপ্তচরবৃত্তির কাহিনী)।
৮. সালাদিন: অল-পাওয়ারফুল সুলতান অ্যান্ড দ্য ইউনিফায়ার অব ইসলাম – স্ট্যানলি লিন-পুল। (উনিশ শতকের শেষের দিকে লেখা একটি ক্লাসিক জীবনী)।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...