দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক বিষয়ে “ন্যায্য ও সুষ্ঠু” আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে তেহরান। তবে কোনো ধরনের “চাপ বা নির্দেশ” মেনে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না—এমন পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
শুক্রবার ইস্তাম্বুল সফরকালে সংবাদ সম্মেলনে আরাঘচি বলেন, “আমরা কোনো অবস্থাতেই চাপ বা আরোপিত শর্ত মেনে নেব না।” তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যোগ করেন, তবে ইরান এমন যেকোনো “অর্থপূর্ণ, যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায্য” কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রস্তুত।
এখনো পরিষ্কার নয়, কবে বা কোন ফরম্যাটে এই সম্ভাব্য আলোচনা হতে পারে। আরাঘচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বৈঠকের ব্যবস্থা এখনো হয়নি। তবে তিনি সতর্ক করেন, “হুমকির মুখে বসে আলোচনা হতে পারে না।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ইরানের “প্রতিরক্ষা সক্ষমতা” এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, কোনো দেশই নিজের নিরাপত্তা বা জাতীয় প্রতিরক্ষা নিয়ে আপস করতে রাজি নয়।”
ট্রাম্পের হুমকি ও আলোচনার ইঙ্গিত
এই ঘোষণা আসছে এমন সময়, যখন ওয়াশিংটন থেকে নতুন করে হুমকি আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ইরানকে আহ্বান জানান, যাকে তিনি “ন্যায্য” পারমাণবিক চুক্তি বলছেন, তাতে স্বাক্ষর করতে—নয়তো সম্ভাব্য আরেকটি মার্কিন সামরিক হামলার মুখোমুখি হতে হতে পারে তেহরানকে।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলছেন এবং আরও আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “এখন অনেক বড় ও শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ইরানের দিকে যাচ্ছে—আশা করি সেগুলো ব্যবহার করতে হবে না।” তিনি কার সঙ্গে কথা বলেছেন, তা উল্লেখ না করলেও তার দেওয়া বার্তার কথা জানান। তিনি বলেন, দুটো জিনিস স্পষ্ট করেছেন: এক—পারমাণবিক অস্ত্র নয়; দুই—বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইরানে সরকারবিরোধী প্রতিবাদে কঠোর দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন বলে খবর এসেছে।
শুক্রবার আরাঘচি জানান, ইরান “পারমাণবিক আলোচনায় আবার যোগ দিতে প্রস্তুত”—তবে তেহরানের দীর্ঘদিনের অবস্থান তিনি পুনরায় তুলে ধরেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। তিনি যোগ করেন, “প্রথমে আলোচনার ফরম্যাট, স্থান এবং এজেন্ডা নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে।”
অঞ্চলে সামরিক মহড়ার ঘোষণা—উভয় পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চলমান থাকায় উভয় পক্ষই এই অঞ্চলে সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, তাদের বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে একটি বহুদিনের বিমান মহড়া পরিচালনা করবে—যার উদ্দেশ্য হবে মার্কিন বিমান বাহিনীর দ্রুত সৈন্য ও বিমান মোতায়েন করার সক্ষমতা শাণিত করা।
একইভাবে ইরানও জানিয়েছে, তার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)—যাকে সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে—আগামী সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি গোলাবর্ষণসহ মহড়া চালাবে। হরমুজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ।
এর জবাবে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানকে সতর্ক করে বলেছে, মহড়া যেন “নিরাপদ, পেশাদার এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতায় অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি সৃষ্টি না করে” এমনভাবে পরিচালিত হয়। সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “মার্কিন বাহিনী, আঞ্চলিক অংশীদার বা বাণিজ্যিক জাহাজের কাছে অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণ সংঘর্ষ, উত্তেজনা বৃদ্ধি ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়ায়।”
উত্তেজনা কমাতে তুরস্কের মধ্যস্থতার প্রস্তাব
আরাঘচির ইস্তাম্বুল সফরের সময় তুরস্ক জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে “সুবিধাদাতা ভূমিকা” নিতে প্রস্তুত রয়েছে আঙ্কারা। তুর্কি প্রেসিডেন্সি জানায়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে টেলিফোন আলাপে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত তুর্কি প্রেসিডেন্সির বিবৃতিতে বলা হয়, “উভয় নেতা তুরস্ক-ইরান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং অঞ্চলে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।”
আরাঘচি সাংবাদিকদের বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্যরা যেসব লক্ষ্যের কথা বলছে, সেগুলো আমাদের আরও ঘনিষ্ঠ পরামর্শ, আঞ্চলিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় রাখা জরুরি করে তুলেছে।”
এদিকে মস্কো জানিয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানির সঙ্গে এক বৈঠক করেছেন। আগে ঘোষণা না দেওয়া এ বৈঠকে ঠিক কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি ক্রেমলিন।
এর এক দিন আগে পুতিন প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতার দিকে রাশিয়া “অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে” নজর রাখছে। এর মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে ‘ন্যায়সঙ্গত ও সম্মানজনক’ শর্তে আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাপ–হুমকি ও সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা—দুই দিক থেকেই সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

