কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের কথা উঠলে যে নামটি ইতিহাসের পাতায় সর্বপ্রথম আসে, তা হলো সায়মন। এটি কেবল একটি হোটেল নয়, বরং বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের এক জীবন্ত সাক্ষী। হোটেলটি বর্তমানে মূলত সায়মন হেরিটেজ হিসেবে পরিচিত, যা কক্সবাজারের আভিজাত্যের প্রতীক। কক্সবাজারের পর্যটন ইতিহাসের কথা বললে ‘সায়মন’ নামটা অনেকটা কিংবদন্তির মতো।
সৈকতের শহরে যারা কংক্রিটের মাঝে ইতিহাস আর আভিজাত্যের ছোঁয়া পেতে চান, তাদের জন্য সায়মন হেরিটেজ একটি আদর্শ নাম। এটি কেবল একটি থাকার জায়গা নয়, বরং কক্সবাজারের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি বিশ্বজুড়ে অনেকের কাছে পরিচিত, যারা ষাট এর দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে কক্সবাজার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যেতেন।
সায়মন হেরিটেজ শুধু একটি বহুতল ভবন নয়, এটি কক্সবাজারের বিবর্তন আর আভিজাত্যের একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ। এর নকশা আধুনিক স্থাপত্যপ্রেমীদের যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি পুরনো পর্যটকদের মনে করিয়ে দেয় ষাটের দশকের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা। সায়মন হেরিটেজের নকশায় সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর Legacy বা উত্তরাধিকারকে ধরে রাখা। পুরনো সায়মন হোটেলের সেই রাজকীয় আভিজাত্যকে বজায় রেখে এখনো এটি সম্পূর্ণ আধুনিক ‘মডার্ন ট্রপিক্যাল’। এর স্থাপত্যে এমন এক আবহাওয়ায় তৈরি করা হয়েছে যা একই সাথে আপনাকে নস্টালজিক করবে আবার আধুনিক বিলাসের স্বাদও দেবে। সায়মন হেরিটেজের অভ্যন্তর এবং এক্সটেরিয়র ডিজাইনে বিশাল কাঁচের দেয়াল এবং ওপেন স্পেস ব্যবহার করা হয়েছে। এর নকশায় প্রশস্ত ব্যালকনিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা কক্সবাজারের নোনা বাতাস আর বিকেলের রোদে বসে সময় কাটানোর জন্য আদর্শ। এর বাইরের অংশজুড়ে সবুজ বাগান আর ঝাউবনের আবহ তৈরি করা হয়েছে যাতে কংক্রিটের ভবনের মাঝেও প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যায়।
বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। আর এই সৈকতের বালুকাভূমিতে আতিথেয়তার প্রথম বীজটি বপন করেছিল ‘হোটেল সায়মন’। ৬ দশকেরও বেশি সময় পূর্বে অর্থাৎ ১৯৬৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ অব্দি তার আভিজাত্য এবং ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে পর্যটকদের কাছে পছন্দের শীর্ষে অবস্থান করছে। আজও এটি কক্সবাজারের সবচেয়ে নান্দনিক আকর্ষণীয় ভবন হিসেবে রয়ে গেছে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের পুরনো হলেও এখনো এটি সবচেয়ে নান্দনিকভাবে মনোরম।
সায়মন হেরিটেজের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং গৌরবময়। সাঈদুর রহমানের (এস রহমান) হাত ধরে এটি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হোটেলটি। স্মৃতি আর আধুনিকতার এক অপূর্ব মিশেল হলো সায়মন। এটি ছিল কক্সবাজারের প্রথম বেসরকারি পর্যায়ের আধুনিক ৫ তারকা মানের হোটেল। তৎকালীন সময়ে কক্সবাজারে আগত ভিআইপি এবং পর্যটকদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঠিকানা ছিল এই সায়মন। দেশ ও বিদেশের এলিট শ্রেণীর মানুষদের অবকাশকালীন প্রিয় ঠিকানা ছিলো এটি। দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতিমান মানুষের স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে এর সঙ্গে। একসময় উপমহাদেশের অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ, চিত্রতারকার পদচারণায় মুখরিত হয়েছে হোটেল সায়মন-এর প্রাঙ্গন।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ ‘কাসাব্লাঙ্কা’-তে দেশি ও আন্তর্জাতিক মানের সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করে আসছে তারা। এছাড়া রয়েছে ‘সানসেট বার’, যেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। তবে একথা বলতেই হয় যে বাংলাদেশের পর্যটনকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে সায়মন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিদেশি পর্যটক ও কূটনীতিকদের থাকার জন্য এটিই ছিল প্রধান গন্তব্য। বর্তমানেও এটি তার উচ্চমানের সেবা এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে দেশের পর্যটন খাতের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
দেশের পর্যটন খাতে অবদানের জন্য সায়মন হেরিটেজকে ‘লিডিং হেরিটেজ হোটেল’ হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ সাউথ এশিয়ান ট্রাভেল অ্যাওয়ার্ডস-২০২৪ পুরস্কার পেয়েছিল। যেখানে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের পর্যটন ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও কক্সবাজারের আথিতেয়তার পরিচয় উজ্জ্বল করছে।
কিন্তু ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত যে দশকের পর দশক ধরে হোটেলটি অনন্য রয়ে গেছে। হোটেলটি স্থাপত্য ও ঐতিহাসিকভাবে কক্সবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এবং কক্সবাজারে আসা দর্শনার্থীদের দ্বারা তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃত। এর একটি বাস্তব ইতিহাস রয়েছে এবং এটিই একে অন্যান্য পাঁচ তারকা হোটেল থেকে আলাদা করে।
এ প্রসঙ্গে পেনিনসুলা এবং সায়মন হেরিটেজের বর্তমান চেয়ারম্যান মাহবুব উর রহমান বলেন, ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সাফল্যের সঙ্গে আমরা হোটেল ব্যবসায় আছি অন্যরা যা কল্পনা করেনি আমরা সেটাই করে দেখিয়েছি। সায়মন হেরিটেজের সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক। এটাকে কখনই আমরা ব্যাবসায়িক হোটেল ভাবিনা। সায়মন একটি পর্যটকবান্ধব হোটেল। এটা আমাদের দেশের হোটেল সাম্রাজ্যের এক টুকরো ইতিহাস।’
(তথ্য সংগ্রহ ও লেখা, রাকিবুল ইসলাম রাফি – এপিক ভার্স জার্নাল)

